প্রযুক্তি দুনিয়ায় মার্ক জাকারবার্গের পরিচিতি শুধু ফেসবুকের সহপ্রতিষ্ঠাতা কিংবা মেটার প্রধান নির্বাহী হিসেবে নয়। দীর্ঘদিন ধরে তাঁর পোশাকের ধরনও ছিল আলোচনার বিষয়। ধূসর টি-শার্ট, সাধারণ হুডি আর অনাড়ম্বর পোশাকেই অভ্যস্ত ছিলেন তিনি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চেনা স্টাইলে এসেছে পরিবর্তন। এখন তাঁর পোশাকে দেখা যায় বিলাসবহুল ব্র্যান্ড, বিশেষভাবে নকশা করা টি-শার্ট এবং বিরল ঘড়ির উপস্থিতি।
২০০৪ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ফেসবুক প্রতিষ্ঠা করেন জাকারবার্গ। পড়াশোনা শেষ না করেই প্রযুক্তি ব্যবসায় মনোযোগী হন তিনি। পরে ২০১৭ সালে হার্ভার্ডে ফিরে সম্মানসূচক ডিগ্রি গ্রহণ করেন এবং সমাবর্তনে বক্তব্য দেন। সেই তরুণ উদ্যোক্তা আজ বিশ্বের অন্যতম ধনী ব্যক্তি। ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি তাঁর জীবনযাপন ও ব্যক্তিগত রুচির পরিবর্তনও এখন আগ্রহের বিষয়।

ধূসর টি-শার্টের পরিচিতি
একসময় জাকারবার্গের পোশাকের ধরন ছিল বেশ সরল। একই ধরনের ধূসর টি-শার্ট পরার অভ্যাস তাঁকে অন্য অনেক প্রযুক্তি উদ্যোক্তার তুলনায় আলাদা পরিচিতি দিয়েছিল। প্রতিদিন কী পোশাক পরবেন, তা নিয়ে অতিরিক্ত সময় ব্যয় না করার ধারণার সঙ্গে এই অভ্যাসের সম্পর্ক ছিল।
তবে তাঁর পোশাক দেখতে সাধারণ হলেও সেগুলোর দাম সব সময় সাধারণ ছিল না। ইতালীয় বিলাসবহুল ব্র্যান্ড ব্রুনেলো কুচিনেলির ধূসর টি-শার্ট পরতেও দেখা গেছে তাঁকে। অর্থাৎ, বাহ্যিক সরলতার আড়ালে দামি পোশাকের উপস্থিতি আগেও ছিল।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাঁর পোশাকে যুক্ত হয়েছে আরও বৈচিত্র্য। ঢিলেঢালা কাটের টি-শার্ট, ব্যক্তিগত স্লোগানযুক্ত পোশাক, বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের নকশা এবং দামি ঘড়ি তাঁর স্টাইলের আলোচিত অংশ হয়ে উঠেছে।
ডিজাইনার টি-শার্টে ব্যক্তিগত বার্তা
জাকারবার্গের সাম্প্রতিক স্টাইলের অন্যতম আকর্ষণ নকশা করা টি-শার্ট। মার্কিন ডিজাইনার মাইক আমিরির প্রতিষ্ঠিত আমিরি ব্র্যান্ডের পোশাকের সঙ্গে তাঁর নাম আলোচনায় এসেছে। এসব পোশাকের কাট ও নকশায় রয়েছে আরামদায়ক স্ট্রিটওয়্যারের প্রভাব।
কিছু টি-শার্টে ব্যক্তিগত স্লোগানও দেখা যায়। এর মধ্যে রয়েছে ‘বিল্ডিং ইজ মাই লাভ ল্যাঙ্গুয়েজ’, যার ভাবার্থ হলো, কিছু তৈরি করাই তাঁর ভালোবাসা প্রকাশের ভাষা। প্রযুক্তি পণ্য নির্মাণ ও উদ্ভাবনের সঙ্গে যুক্ত একজন উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে এমন বার্তা তাঁর কাজের প্রতি আগ্রহের প্রতিফলন হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
আরেকটি আলোচিত বাক্য ‘Aut Zuck, aut nihil’। এটি লাতিন ‘Aut Caesar aut nihil’ কথাটির অনুকরণ, যার অর্থ ‘সিজার হও, নয়তো কিছুই নয়’। এখানে ‘সিজার’-এর পরিবর্তে নিজের নামের সংক্ষিপ্ত রূপ ব্যবহার করেছেন জাকারবার্গ। তবে তাঁর জন্য তৈরি পোশাকগুলোর উৎপাদনসংক্রান্ত সব তথ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
কোয়ায়েট লাক্সারি ও স্ট্রিটওয়্যারের মিশেল
জাকারবার্গের বর্তমান স্টাইলে দুটি প্রবণতা লক্ষ করা যায়। একদিকে রয়েছে স্ট্রিটওয়্যারের স্বচ্ছন্দ ভাব, অন্যদিকে দামি কাপড় ও পরিমিত নকশার প্রতি আগ্রহ।
ফ্যাশনের ভাষায় ‘কোয়ায়েট লাক্সারি’ বলতে এমন বিলাসবহুল পোশাককে বোঝায়, যেখানে বড় লোগো কিংবা অতিরিক্ত চাকচিক্যের বদলে কাপড়ের মান, কাটিং ও নির্মাণশৈলীতে গুরুত্ব দেওয়া হয়। জাকারবার্গের কিছু পোশাকেও এই প্রবণতার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়।
আবার ঢিলেঢালা টি-শার্ট, শর্টস ও স্লাইড স্যান্ডেলের মতো অনানুষ্ঠানিক পোশাকও তাঁর ব্যক্তিগত স্টাইলের অংশ। ফলে তাঁর ফ্যাশনকে কেবল আনুষ্ঠানিক বিলাসিতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। আরাম, ব্যক্তিগত পছন্দ ও ডিজাইনার পোশাকের সমন্বয়ই এখানে বেশি চোখে পড়ে।
প্রাডার ফ্যাশন শোতে জাকারবার্গ
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্ত্রী প্রিসিলা চ্যানকে সঙ্গে নিয়ে মিলান ফ্যাশন উইকে প্রাডার অটাম-উইন্টার ২০২৬-২৭ সংগ্রহের প্রদর্শনীতে উপস্থিত হন জাকারবার্গ। দুজনকে অনুষ্ঠানের সামনের সারিতে দেখা যায়। তাঁদের পোশাক নিয়েও ফ্যাশনমহলে আলোচনা হয়।
প্রযুক্তি ও ফ্যাশনের সম্পর্ক এখন আগের চেয়ে বিস্তৃত। স্মার্ট চশমা ও পরিধানযোগ্য প্রযুক্তির মতো পণ্যে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহ বাড়ছে। এ কারণে প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের ফ্যাশন জগতের অনুষ্ঠানে উপস্থিতিও বাড়তি মনোযোগ পায়। তবে জাকারবার্গের ফ্যাশন শোতে অংশ নেওয়াকে কোনো নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক চুক্তির প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বিরল ঘড়ির প্রতিও ঝোঁক
পোশাকের পাশাপাশি জাকারবার্গের ঘড়ির সংগ্রহও আলোচনায় এসেছে। একসময় তাঁকে সাধারণ পোশাকে বেশি দেখা গেলেও এখন কবজিতে দেখা যায় দামি ও বিশেষভাবে নির্মিত ঘড়ি।
তাঁর আলোচিত সংগ্রহের একটি হলো সুইস ঘড়ি নির্মাতা গ্রুবেল ফরসের ‘হ্যান্ড মেড ১’। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মেটার নীতিগত পরিবর্তন নিয়ে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে এই ঘড়ি পরেছিলেন তিনি। ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘড়িটির দাম প্রায় ৯ লাখ মার্কিন ডলার। নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুসারে, এটি হাতে তৈরি করতে প্রায় ৬ হাজার ঘণ্টা সময় লাগে।
এ ছাড়া ডি বেথুন, এফ পি জর্নে ও পাটেক ফিলিপের মতো ঘড়ি নির্মাতাদের মডেল পরতেও দেখা গেছে জাকারবার্গকে। এসব ব্র্যান্ডের কিছু ঘড়ি সীমিত সংখ্যায় তৈরি হয় এবং সেগুলোর দাম কয়েক লাখ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। তবে মডেল, সংস্করণ ও বাজারদরের ওপর নির্ভর করে প্রতিটি ঘড়ির মূল্য আলাদা হয়।
সম্পদের সঙ্গে বদলেছে ব্যক্তিগত স্টাইলও?
২০২৬ সালের অক্টোবরের ব্লুমবার্গ বিলিয়নেয়ার্স ইনডেক্স অনুযায়ী, জাকারবার্গের আনুমানিক সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২৬১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তাঁর সম্পদের বড় অংশ মেটা প্ল্যাটফর্মসের শেয়ারের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে শেয়ারবাজারের ওঠানামার সঙ্গে তাঁর সম্পদের হিসাবও পরিবর্তিত হয়।
বিশাল সম্পদের মালিক হওয়া তাঁর বিলাসবহুল পোশাকের প্রতি আগ্রহের একটি সম্ভাব্য প্রেক্ষাপট হলেও, স্টাইল বদলের একমাত্র কারণ হিসেবে একে দেখা ঠিক হবে না। ব্যক্তিগত রুচি, জীবনযাপনের পরিবর্তন এবং জনসমক্ষে নিজেকে উপস্থাপনের ধরনও এখানে ভূমিকা রাখতে পারে।
জাকারবার্গের ব্যক্তিগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ স্ত্রী প্রিসিলা চ্যান ও তাঁদের তিন মেয়ে। কাজের বাইরে পরিবারের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তও মাঝেমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাগ করে নেন তিনি।
প্রযুক্তির বাইরেও নতুন পরিচিতি
মার্ক জাকারবার্গের পোশাকের পরিবর্তন দেখায়, পরিচিত কোনো ব্যক্তিত্বের স্টাইলও সময়ের সঙ্গে বদলে যেতে পারে। একসময় সরল ধূসর টি-শার্ট ও হুডিতে সীমাবদ্ধ ছিল তাঁর জনপরিচিত পোশাকের ধরন। এখন সেই জায়গায় যুক্ত হয়েছে ডিজাইনার পোশাক, বিলাসবহুল ঘড়ি ও আন্তর্জাতিক ফ্যাশন আয়োজন।
তবে তাঁর স্টাইলের মূল বৈশিষ্ট্য পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। আরামদায়ক পোশাকের প্রতি ঝোঁক এখনো রয়েছে, শুধু তাতে যোগ হয়েছে আরও বেশি বৈচিত্র্য ও বিলাসিতার ছোঁয়া। প্রযুক্তির দুনিয়ায় নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠার পর ব্যক্তিগত ফ্যাশনেও জাকারবার্গের এই পরিবর্তন তাঁকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।












