সম্প্রতি টাঙ্গাইলের হেমনগর জমিদারবাড়িতে এমনই এক আয়োজনের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া সেই আয়োজন ছিল ফ্যাশন ব্র্যান্ড সাভাটা বাই রিফাহ্র বিয়ের পোশাকের ফটোশুট। তবে এটি শুধু পোশাকের ছবি তোলার আয়োজন ছিল না। পুরোনো একটি সময়কে ঘিরে ভালোবাসার গল্প বলার পরিকল্পনা থেকেই সাজানো হয়েছিল পুরো ফটোশুট।
ছবিতে ফিরে দেখা ১৯৫১

এই আয়োজনের গল্পের সময়কাল ধরা হয়েছিল ১৯৫১ সাল। সেই সময়ের একটি প্রেমের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে সাজানো হয় পুরো ফটোশুট। গল্পের সঙ্গে যুক্ত করা হয় তৎকালীন সামাজিক পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতার নানা উপাদান।
তবে ছবিগুলোকে পুরোপুরি অতীতের মধ্যে আটকে রাখা হয়নি। পুরোনো দিনের আবহের সঙ্গে বর্তমান সময়ের ফ্যাশনের সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। ফলে একদিকে দেখা গেছে ঐতিহ্যবাহী পরিবেশ, অন্যদিকে পোশাক, সাজ ও ছবির উপস্থাপনায় ছিল আধুনিকতার ছোঁয়া।
এই গল্পকে দৃশ্যমান করে তুলতে হেমনগর জমিদারবাড়িকে বেছে নেন ফটোগ্রাফার ও পরিকল্পনাকারী রনি রেজাউল।
কেন হেমনগর জমিদারবাড়ি?
একটি নির্দিষ্ট গল্পকে ছবিতে ফুটিয়ে তুলতে শুধু সুন্দর লোকেশন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন গল্পের সঙ্গে জায়গাটির একটি সম্পর্কও। শুরু থেকেই রনি রেজাউলের পরিকল্পনায় ছিল এমন একটি স্থান, যেখানে পুরোনো সময়ের আবহ, স্থাপত্য এবং সংস্কৃতির ছাপ একসঙ্গে পাওয়া যাবে।
হেমনগর জমিদারবাড়ি দেখার পর সেই ভাবনাই যেন বাস্তব রূপ পায়। বিশাল পরিসরের বাড়ি, বিভিন্ন ধরনের স্থাপত্য এবং একাধিক আলাদা অংশ থাকায় একই লোকেশনে নানা দৃশ্য তৈরি করার সুযোগ ছিল।
ফলে বাড়িটির একেকটি অংশে তৈরি করা হয়েছে একেকটি দৃশ্য। কোথাও বিয়ের আয়োজন, কোথাও দুই পরিবারের আলাদা পরিবেশ, আবার কোথাও তৈরি হয়েছে গল্পের এমন মুহূর্ত, যার অর্থ পরের ছবির সঙ্গে মিলিয়ে বুঝতে হয়।
এভাবেই আলাদা আলাদা ছবি মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ গল্প বলার চেষ্টা করা হয়েছে।
শুটিংয়ের আগেই বদলে ফেলা হয়েছিল পরিবেশ
এত বড় আয়োজনের জন্য শুধু ক্যামেরা ও মডেল নিয়ে লোকেশনে হাজির হলেই হয়নি। শুটিংয়ের প্রায় পাঁচ থেকে ছয় দিন আগে থেকেই রনি রেজাউল ও তাঁর দল হেমনগর জমিদারবাড়ির বিভিন্ন অংশ পরিষ্কার এবং রঙের কাজ শুরু করেন।
জায়গাটিকে গল্পের উপযোগী করে তোলার পাশাপাশি কোন অংশে কোন দৃশ্য হবে, কোথায় মডেলরা দাঁড়াবেন এবং কীভাবে ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে, সেসব নিয়েও আগে থেকেই পরিকল্পনা করা হয়।

পুরো কাজটির পরিকল্পনা অবশ্য শুরু হয়েছিল আরও আগে। জানুয়ারি থেকেই শুরু হয় প্রস্তুতি। এরপর ধাপে ধাপে পোশাক নির্বাচন ও নকশা, মডেল বাছাই, সাজসজ্জা এবং অন্যান্য প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া হয়।
শেষ পর্যন্ত দুই দিনে সম্পন্ন হয় মূল ফটোশুট।
শুটিং দেখতে ভিড়, একপর্যায়ে বন্ধ কাজ
বড় আয়োজন হওয়ায় শুটিংয়ের দিন নতুন আরেকটি সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় আয়োজকদের। ফটোশুট দেখতে স্থানীয় মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে।
একপর্যায়ে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে প্রথম দিন প্রায় এক ঘণ্টা শুটিং বন্ধ রাখতে হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে আবার কাজ শুরু করা হয়।
তবে শুটিং শেষ হওয়ার পরও সেই ভিড় থামেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিগুলো ছড়িয়ে পড়ার পর হেমনগর জমিদারবাড়িকে দেখতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন অনেকে।
শুধু ফটোশুটের জায়গা নয়, ঐতিহ্যের অংশ
ফটোশুটটি ভাইরাল হওয়ার পর হেমনগর জমিদারবাড়িও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিষয়টি নিয়ে রনি রেজাউল মনে করেন, এমন ঐতিহাসিক স্থাপনা শুধু ছবি বা ভিডিও তৈরির লোকেশন হিসেবে দেখলে চলবে না। এগুলো দেশের ঐতিহ্যের অংশ এবং সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
তাঁর মতে, সরকারি উদ্যোগে এ ধরনের পুরোনো স্থাপনার সংরক্ষণ ও উন্নয়নের দিকে আরও মনোযোগ দেওয়া দরকার।
কারণ সময়ের সঙ্গে পুরোনো ভবনগুলোর অনেক কিছুই হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা গেলে এসব স্থাপনা একদিকে যেমন ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকতে পারে, অন্যদিকে পর্যটন ও সৃজনশীল কাজের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বড় আয়োজন, ছিলেন ৪০ শিল্পী
এই ফটোশুটে শুধু মূল মডেলরাই ছিলেন না। পুরো আয়োজনকে জীবন্ত করে তুলতে যুক্ত করা হয়েছিল আরও প্রায় ৪০ জন শিল্পী। ফলে প্রতিটি দৃশ্যের জন্য ছিল আলাদা পরিকল্পনা।
কে কোন পোশাকে থাকবেন, কোন দৃশ্যে কোথায় অবস্থান করবেন, কীভাবে পুরোনো সময়ের পরিবেশ ফুটিয়ে তোলা হবে, সবকিছুই আগে থেকে নির্ধারণ করা হয়েছিল।
ফটোশুটের নির্দেশনা ও ফটোগ্রাফির দায়িত্বে ছিলেন রনি রেজাউল। তাঁর সঙ্গে ফটোগ্রাফি সহকারী হিসেবে ছিলেন মুক্তাদির মাহী। স্টাইলিংয়ে ছিলেন মাশরুর রহমান নিহাল, মেকআপে পারভেজ এবং ভিডিওগ্রাফিতে শুভদীপ্ত সরকার।
নারী মডেল হিসেবে ছিলেন মাইসা, শীলা, তুবা, প্রিয়ন্তী, মঞ্জিতা, প্রিয়াঙ্কা, সাফা মারুয়া, ইলা ও আরোহে। পুরুষ মডেল ছিলেন রেহান, রাব্বি, ইমন, জারিফ ও আকাশ।
পুরোনো জমিদারবাড়ির স্থাপত্য, ১৯৫১ সালের প্রেমের গল্প এবং সমকালীন ফ্যাশনের মেলবন্ধনই শেষ পর্যন্ত এই আয়োজনকে আলাদা করে তুলেছে। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিগুলো যেন নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে, ইতিহাসের পুরোনো কোনো জায়গাকেও সৃজনশীল উপস্থাপনায় নতুনভাবে আবিষ্কার করা সম্ভব।












