শুধু প্রাকৃতিক উৎস বা গোলাপি রং দেখেই কি এটিকে স্বাস্থ্যকর বলা যায়? পিংক সল্ট নিয়ে প্রচলিত নানা দাবির পেছনে আসলে কতটা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে?
কীভাবে তৈরি হয় এই লবণ
হিমালয়ান পিংক সল্ট মূলত পাকিস্তানের পাঞ্জাব অঞ্চলের সল্ট রেঞ্জ ও খেওড়া লবণখনি থেকে উত্তোলন করা হয়। ধারণা করা হয়, বহু প্রাচীন জলাধারের পানি শুকিয়ে যাওয়ার পর জমে থাকা লবণের স্তর থেকেই এই লবণের সৃষ্টি।
সাধারণত এটি অপেক্ষাকৃত কম প্রক্রিয়াজাত করা হয়। লবণের গোলাপি রঙের পেছনে থাকা অন্যতম কারণ হলো এতে অল্প পরিমাণে থাকা আয়রনসহ বিভিন্ন খনিজ উপাদান।
তবে নামের মধ্যে ‘হিমালয়ান’ থাকলেও এর প্রধান উৎস হিমালয় পর্বতমালার ভেতর নয়; এটি মূলত পাকিস্তানের পাঞ্জাবের খেওড়া অঞ্চলের লবণখনি থেকে আসে।
মূল উপাদান কিন্তু একই
পিংক সল্ট আর সাধারণ খাবার লবণের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিল হলো দুটিরই প্রধান উপাদান সোডিয়াম ক্লোরাইড। পিংক সল্টে সোডিয়ামের পাশাপাশি বিভিন্ন খনিজ ও অন্যান্য উপাদান অতি সামান্য পরিমাণে থাকতে পারে। এ কারণে অনেক সময় এতে ‘৮৪ ধরনের খনিজ’ থাকার দাবি শোনা যায়। কিন্তু এসব খনিজের অধিকাংশই এত অল্প পরিমাণে থাকে যে, শুধু পিংক সল্ট খেয়ে শরীরের প্রয়োজনীয় খনিজের উল্লেখযোগ্য অংশ পাওয়া যায় এমনটা ধরে নেওয়ার কারণ নেই।
পিংক সল্টের উপকারের দাবি কতটা সত্য?
পিংক সল্ট নিয়ে নানা ধরনের স্বাস্থ্য উপকারের কথা প্রচলিত আছে। কেউ দাবি করেন, এটি শরীরের পিএইচের ভারসাম্য ঠিক রাখতে সাহায্য করে, কেউ বলেন ঘুম ভালো হয়। আবার রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ, শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা কমানো, বার্ধক্যের লক্ষণ কমানো কিংবা যৌন আকাঙ্ক্ষা বাড়ানোর মতো দাবিও শোনা যায়।

কিন্তু এসব দাবির বেশির ভাগের পক্ষে শক্ত গবেষণাভিত্তিক প্রমাণ নেই। শরীরের পিএইচ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও পিংক সল্টের বিশেষ ভূমিকা থাকার কথা নয়। মানুষের শরীরে ফুসফুস ও কিডনি স্বাভাবিকভাবেই অ্যাসিড-ক্ষারের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পিংক সল্টে থাকা অল্প পরিমাণ খনিজ এই ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনে এমন প্রমাণ নেই।
ঘুমের ক্ষেত্রে কী?
লবণ ও ঘুম নিয়ে কিছু গবেষণায় কম সোডিয়াম গ্রহণের সঙ্গে ঘুমের সমস্যার সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ঘুম ভালো করার জন্য বিশেষভাবে হিমালয়ান পিংক সল্ট খেতে হবে। কারণ শরীরের প্রয়োজনীয় সোডিয়াম সাধারণ খাবার লবণ থেকেও পাওয়া যায়। ওই গবেষণাগুলো পিংক সল্টকে আলাদা করে ঘুমের জন্য বেশি কার্যকর প্রমাণ করে না।
তাহলে কোনটি বেশি স্বাস্থ্যকর?

এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো পিংক সল্ট ও সাধারণ লবণের স্বাস্থ্যগত প্রভাব সরাসরি তুলনা করে একটিকে অন্যটির চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি উপকারী প্রমাণ করার মতো পর্যাপ্ত গবেষণা নেই।
পিংক সল্টে অতিরিক্ত কিছু খনিজ থাকলেও সেগুলোর পরিমাণ সাধারণত খুবই কম। ফলে শুধু ‘প্রাকৃতিক’ বা ‘খনিজসমৃদ্ধ’ বলেই এটিকে সাধারণ লবণের তুলনায় অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
বরং লবণ যেটিই হোক, অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তাই পিংক সল্ট ব্যবহার করলেও পরিমাণের দিকে নজর রাখা জরুরি।
পিংক সল্টের আসল পার্থক্য কোথায়?
স্বাস্থ্যের দিক থেকে বড় কোনো পার্থক্যের প্রমাণ না থাকলেও পিংক সল্টের রং, দানার ধরন, স্বাদ ও কম প্রক্রিয়াজাত হওয়ার বৈশিষ্ট্য অনেকের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে। রান্না বা খাবার পরিবেশনে এর আলাদা চেহারাও জনপ্রিয়তার একটি কারণ।
তবে এসব বৈশিষ্ট্যকে চিকিৎসাগত বা বিশেষ স্বাস্থ্য উপকার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাই সাধারণ লবণের বদলে পিংক সল্ট ব্যবহার করতে চাইলে স্বাদ বা ব্যক্তিগত পছন্দের ভিত্তিতে করা যেতে পারে, কিন্তু বাড়তি স্বাস্থ্য উপকারের আশায় এটি বেছে নেওয়ার মতো শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো নেই।












