শিশুরা বড়দের তুলনায় বিভিন্ন সংক্রমণে বেশি আক্রান্ত হতে পারে। বিশেষ করে ছোট বয়সে সর্দি, কাশি, জ্বরসহ নানা অসুখ নিয়ে উদ্বেগে থাকেন অভিভাবকেরা। তাই অনেকেই শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন খাবার, ভিটামিন কিংবা ইমিউনিটি বুস্টারের সন্ধান করেন। তবে শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ভালো রাখার জন্য কোনো একক জাদুকরি ওষুধ নেই। বরং সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম, টিকাদান ও পরিচ্ছন্নতার মতো নিয়মিত অভ্যাসই এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
১. প্রথম ছয় মাস মায়ের দুধ
জন্মের পর যত দ্রুত সম্ভব শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো শুরু করা উচিত। সাধারণভাবে জীবনের প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের দুধ খাওয়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। মায়ের দুধে প্রয়োজনীয় পুষ্টির পাশাপাশি অ্যান্টিবডি ও অন্যান্য রোগপ্রতিরোধী উপাদান থাকে, যা শিশুকে বিভিন্ন সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে।
ছয় মাস পূর্ণ হলে মায়ের দুধের পাশাপাশি বয়স উপযোগী পরিপূরক খাবার শুরু করতে হয়। এরপরও শিশুর চাহিদা অনুযায়ী মায়ের দুধ চালিয়ে যাওয়া যেতে পারে।
২. সময়মতো সব টিকা
শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে টিকাদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত টিকা শিশুকে বিভিন্ন গুরুতর সংক্রামক রোগ থেকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে। তাই জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি অনুযায়ী শিশুকে সময়মতো সব টিকা দিতে হবে।
কোনো টিকা বাদ পড়লে নতুন করে পুরো কর্মসূচি শুরু করার প্রয়োজন আছে কি না, তা নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে স্বাস্থ্যকর্মী বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। বয়স ও আগের টিকার ইতিহাস অনুযায়ী বাদ পড়া টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা করা যায়।
৩. সুষম ও পুষ্টিকর খাবার
শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার কার্যক্রমের জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টি প্রয়োজন। বয়স অনুযায়ী খাবারের তালিকায় শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, ডিম, মাছ, মাংস, দুধ ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার রাখা যেতে পারে।
একই ধরনের খাবারের ওপর নির্ভর না করে বৈচিত্র্যপূর্ণ খাবার দেওয়ার চেষ্টা করুন। শিশুর বয়স, খাবার গ্রহণের সক্ষমতা এবং পুষ্টির চাহিদা অনুযায়ী খাবারের ধরন ও পরিমাণ নির্ধারণ করা জরুরি।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ভিটামিন, জিংক বা অন্য কোনো সাপ্লিমেন্ট নিয়মিত দেওয়া উচিত নয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু ভিটামিন ও খনিজ উপাদান শিশুর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
৪. পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা
শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি, মস্তিষ্কের বিকাশ ও রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য ঘুম গুরুত্বপূর্ণ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমের প্রয়োজন বদলায়। তাই শিশুর বয়স অনুযায়ী পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া, ঘুমের আগে শান্ত পরিবেশ তৈরি করা এবং শোবার আগে দীর্ঘ সময় পর্দার সামনে থাকা কমানোর মতো অভ্যাস সহায়ক হতে পারে।
৫. খেলাধুলা ও পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস
বয়স অনুযায়ী নিয়মিত খেলাধুলা ও শারীরিক কার্যক্রম শিশুর সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। শিশুকে নিরাপদ পরিবেশে খেলাধুলার সুযোগ দিন এবং দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয়ভাবে বসে থাকা কমাতে উৎসাহিত করুন।
একই সঙ্গে সাবান ও পানি দিয়ে সঠিকভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। খাবারের আগে, শৌচাগার ব্যবহারের পর এবং বাইরে থেকে ফিরে হাত ধোয়া জরুরি। কাশি বা হাঁচির সময় মুখ ও নাক ঢাকার অভ্যাসও সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
৬. ধূমপানমুক্ত পরিবেশে রাখুন
শিশুর সামনে বা ঘরের ভেতরে ধূমপান করা উচিত নয়। পরোক্ষ ধূমপান শিশুর শ্বাসতন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে এবং শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়।
শুধু শিশুর কাছাকাছি ধূমপান না করলেই যথেষ্ট নয়, ঘর ও গাড়িকে ধূমপানমুক্ত রাখাও জরুরি।
অ্যান্টিবায়োটিক বা ইমিউনিটি বুস্টার কি প্রয়োজন?
শিশুর সামান্য জ্বর, সর্দি বা কাশি হলেই নিজের সিদ্ধান্তে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া ঠিক নয়। বেশির ভাগ সাধারণ সর্দি-কাশি ভাইরাসের কারণে হয়, যার চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না। অপ্রয়োজনীয় ব্যবহারে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু তৈরির ঝুঁকি বাড়ে।
একইভাবে, বাজারে প্রচলিত সব ইমিউনিটি বুস্টার শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়, এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। শিশুর পুষ্টির ঘাটতি বা নির্দিষ্ট কোনো স্বাস্থ্যসমস্যা থাকলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী সাপ্লিমেন্ট দিতে পারেন।
শিশু বারবার গুরুতর সংক্রমণে আক্রান্ত হলে, দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকলে কিংবা ওজন ও বৃদ্ধি প্রত্যাশা অনুযায়ী না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
শিশুর ইমিউনিটি ভালো রাখার সবচেয়ে কার্যকর ভিত্তি হলো স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম, সময়মতো টিকা, নিয়মিত খেলাধুলা এবং পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস শিশুকে সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে সহায়তা করে।












