চুইংগাম চিবানো অনেকের দৈনন্দিন অভ্যাস। মুখের দুর্গন্ধ দূর করা, সতেজ অনুভব করা কিংবা অবসর কাটাতে অনেকেই চুইংগাম বেছে নেন। তবে এই অভ্যাসের ভালো ও খারাপ, দুই দিকই রয়েছে। সঠিক ধরনের চুইংগাম পরিমিত সময় চিবালে দাঁতের সুরক্ষায় কিছুটা উপকার পাওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে, অতিরিক্ত চিবানোর অভ্যাস থেকে দেখা দিতে পারে চোয়ালের ব্যথা, মাথাব্যথা কিংবা হজমের সমস্যা।
তাহলে চুইংগাম চিবানো কি স্বাস্থ্যের জন্য ভালো? উত্তর নির্ভর করছে চুইংগামের ধরন, চিবানোর সময় এবং ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার ওপর।
চুইংগাম চিবানোর উপকারিতা
লালা উৎপাদন বাড়ায়
চুইংগাম চিবানোর ফলে মুখে লালা নিঃসরণ বাড়ে। এই লালা খাবারের অবশিষ্টাংশ সরাতে এবং মুখের ভেতরে তৈরি হওয়া অ্যাসিডের প্রভাব কমাতে সাহায্য করে। এতে দাঁতের এনামেল সুরক্ষিত রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে খাবারের পর চিনি ছাড়া চুইংগাম চিবানো মুখের অম্লতা কমাতে সহায়ক হতে পারে।

দাঁতের ক্ষয়ের ঝুঁকি কমাতে পারে
সব চুইংগাম দাঁতের জন্য সমান উপকারী নয়। চিনিযুক্ত চুইংগাম মুখের ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে অ্যাসিড তৈরি করে দাঁতের ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অন্যদিকে, চিনি ছাড়া চুইংগাম, বিশেষ করে জাইলিটলযুক্ত গাম, লালা উৎপাদন বাড়িয়ে দাঁতের ক্ষয় প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারে। তবে এটি নিয়মিত দাঁত ব্রাশ ও ফ্লস করার বিকল্প নয়।
মুখের দুর্গন্ধ কমাতে সাহায্য করে
চুইংগাম চিবালে লালা বাড়ে, যা মুখের কিছু দুর্গন্ধ সৃষ্টিকারী উপাদান দূর করতে সহায়তা করে। মিন্ট বা অন্যান্য সুগন্ধযুক্ত চুইংগাম সাময়িকভাবে শ্বাসের দুর্গন্ধও ঢেকে রাখতে পারে। তবে দীর্ঘদিন মুখে দুর্গন্ধ থাকলে দাঁত ও মাড়ির সমস্যা কিংবা অন্য কোনো শারীরিক কারণ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
মানসিক চাপ ও মনোযোগে সম্ভাব্য প্রভাব
কিছু গবেষণায় চুইংগাম চিবানোর সঙ্গে সাময়িকভাবে সতর্কতা ও মনোযোগের পরিবর্তনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। কারও কারও ক্ষেত্রে এটি মানসিক চাপ কম অনুভব করতেও সাহায্য করতে পারে। তবে চুইংগাম চিবালেই স্ট্রেস হরমোন কমবে কিংবা মস্তিষ্কে অক্সিজেনের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
অতিরিক্ত চুইংগাম চিবালে কী ক্ষতি হতে পারে?
চোয়ালের সন্ধি ও পেশিতে চাপ
দীর্ঘ সময় ধরে বারবার চিবালে চোয়ালের পেশি ও টেমপোরোম্যান্ডিবুলার জয়েন্টের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। যাঁদের আগে থেকেই চোয়ালের সন্ধিতে সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ব্যথা বা অস্বস্তি বাড়তে পারে। চোয়ালে ক্লিকের শব্দ, মুখ খুলতে অসুবিধা, কানের আশপাশে ব্যথা কিংবা মাথাব্যথাও দেখা দিতে পারে।
দাঁতের ক্ষয়
চিনিযুক্ত চুইংগাম নিয়মিত চিবালে দাঁতের ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই চুইংগাম কেনার সময় উপাদান দেখে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। চিনি ছাড়া চুইংগাম তুলনামূলক ভালো বিকল্প হলেও দাঁতের যত্নে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি।

পেটের সমস্যা
চিনি ছাড়া কিছু চুইংগামে সরবিটল বা অন্যান্য চিনির বিকল্প ব্যবহার করা হয়। অতিরিক্ত পরিমাণে এসব উপাদান গ্রহণ করলে কারও কারও পেট ফাঁপা, গ্যাস কিংবা ডায়রিয়া হতে পারে। চুইংগাম চিবানোর সময় বেশি বাতাস গিলে ফেললেও পেটে অস্বস্তি বাড়তে পারে।
কারা চুইংগাম চিবানো এড়িয়ে চলবেন?
যাঁদের চোয়ালের সন্ধিতে ব্যথা বা টিএমডি সমস্যা রয়েছে, তাঁদের চুইংগাম চিবানোর অভ্যাস সীমিত করা বা এড়িয়ে চলা ভালো। একইভাবে, দাঁতে নতুন ফিলিং বা ইমপ্ল্যান্ট করা হলে কিংবা ব্রেস ব্যবহারের সময় চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
যাঁদের দাঁত কিড়মিড় করার অভ্যাস, চোয়ালের পেশিতে ব্যথা কিংবা চিবানোর কারণে মাইগ্রেনের সমস্যা বাড়ে, তাঁদেরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। ছোট শিশু এবং যাঁদের গিলতে সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে চুইংগাম গলায় আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
কতক্ষণ চুইংগাম চিবানো ভালো?
চুইংগাম চিবানোর জন্য সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। তবে অযথা দীর্ঘ সময় চিবানো এড়িয়ে চলা ভালো। চোয়ালে অস্বস্তি না থাকলে খাবারের পর অল্প সময়ের জন্য চিনি ছাড়া চুইংগাম বেছে নেওয়া যেতে পারে। ১০ থেকে ১৫ মিনিট চিবানো একটি ব্যবহারিক সীমা হতে পারে, যদিও এটি সবার জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে নির্ধারিত বাধ্যতামূলক নিয়ম নয়।
চুইংগাম কেনার সময় চিনি ছাড়া এবং সম্ভব হলে জাইলিটলযুক্ত পণ্য বেছে নিন। চোয়ালে ব্যথা, মাথাব্যথা কিংবা পেটের সমস্যা দেখা দিলে চুইংগাম চিবানো বন্ধ করে উপসর্গের কারণ বুঝতে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সব মিলিয়ে, চুইংগাম নিজে থেকেই ভালো বা মন্দ নয়। সঠিক ধরনের চুইংগাম পরিমিতভাবে চিবালে কিছু উপকার মিলতে পারে। তবে অতিরিক্ত অভ্যাস এবং ব্যক্তিগত শারীরিক সমস্যার বিষয়টি উপেক্ষা করলে উপকারের বদলে অস্বস্তিই বাড়তে পারে।












