সর্দি-জ্বর থেকে আইসিইউ, ফ্লু কতটা ভয়ংকর হতে পারে?

Health

কখনো কখনো ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকেই দেখা দিতে পারে নিউমোনিয়া। পরিস্থিতি আরও জটিল হলে সংক্রমণ রক্তে ছড়িয়ে তৈরি করতে পারে সেপসিস। এমনকি শ্বাসযন্ত্রের মারাত্মক সমস্যা তৈরি হয়ে রোগীকে আইসিইউতেও নিতে হতে পারে।

তাই ফ্লুকে একেবারে তুচ্ছ করে দেখার সুযোগ নেই।

ফ্লু কীভাবে জটিল হয়ে ওঠে?

ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের কারণে হওয়া ফ্লুতে সাধারণত জ্বর, সর্দি, কাশি, গলাব্যথা, মাথাব্যথা ও শরীর ব্যথার মতো উপসর্গ দেখা যায়। বেশির ভাগ মানুষ কয়েক দিনের মধ্যেই সুস্থ হয়ে ওঠেন।

কিন্তু ফ্লু শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে কিছুটা দুর্বল করে দিতে পারে। বিশেষ করে ফুসফুস তখন অন্য সংক্রমণের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। এ সময় ভাইরাসের পাশাপাশি ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণও যুক্ত হতে পারে।

ফলে শুরুতে সাধারণ ফ্লু থাকলেও পরে নিউমোনিয়া দেখা দিতে পারে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তা রক্তে ছড়িয়ে সেপসিসের মতো প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

কিছু ক্ষেত্রে সংক্রমণ মস্তিষ্কে ছড়িয়ে এনকেফালাইটিস বা হৃদ্‌যন্ত্রে প্রদাহ তৈরি করতে পারে। হাঁপানি কিংবা সিওপিডির মতো দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের রোগ যাঁদের আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা আরও গুরুতর হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এমনকি রেসপিরেটরি ফেইলিউর হয়ে আইসিইউ পর্যন্ত যেতে হতে পারে।

কারা বেশি ঝুঁকিতে?

ফ্লু হলেই যে সবার গুরুতর জটিলতা হবে, তা নয়। তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।

শিশু ও বয়স্কদের পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, হাঁপানি, সিওপিডি, হৃদ্‌রোগ বা কিডনির দীর্ঘমেয়াদি সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের বাড়তি সতর্ক থাকতে হয়। অতিরিক্ত স্থূলতা, ক্যানসার কিংবা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দেয় এমন ওষুধ গ্রহণকারীদেরও ফ্লু থেকে জটিলতার ঝুঁকি বেশি।

গর্ভাবস্থাতেও সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ এ সময়ে শরীরে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার কিছু পরিবর্তন ঘটে।

কোন লক্ষণগুলোকে বিপদের সংকেত মনে করবেন?

ফ্লু হলে শুধু জ্বর-সর্দি-কাশি আছে কি না, সেটাই দেখার বিষয় নয়। অসুস্থতার গতিপ্রকৃতিও খেয়াল করতে হবে।

জ্বর অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া বা দীর্ঘ সময় ধরে থাকা, কাশি ও শ্বাসকষ্ট ক্রমেই বেড়ে যাওয়া, অতিরিক্ত দুর্বল হয়ে পড়া, বারবার বমি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, অসংলগ্ন আচরণ কিংবা প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

বিশেষ করে ফ্লু থেকে কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর আবার কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসা, প্রচণ্ড কাশি শুরু হওয়া বা শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া উদ্বেগের কারণ হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে ফ্লুর সঙ্গে নতুন করে ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ বা নিউমোনিয়া হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন হতে পারে।

শিশুর ক্ষেত্রে শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, বুক ভেতরের দিকে দেবে যাওয়া বা অস্বাভাবিক দুর্বল হয়ে পড়াও গুরুতর লক্ষণ।

বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আবার জ্বরের সঙ্গে খাওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত দুর্বলতা, মাথা ঘোরা বা পড়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ফ্লু হলেই কি অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন?

না। ফ্লু সাধারণত ভাইরাসের কারণে হয়। তাই ভাইরাসের সংক্রমণে অ্যান্টিবায়োটিক নিজে থেকে খাওয়া উচিত নয়।

তবে ফ্লুর সঙ্গে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ যুক্ত হলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক দিতে পারেন। তাই জ্বর-কাশি হলেই নিজের সিদ্ধান্তে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

ডায়াবেটিস থাকলে বাড়তি সতর্কতা

ডায়াবেটিসের রোগীদের সংক্রমণের সময় রক্তে শর্করার মাত্রা ওঠানামা করতে পারে। আবার জ্বরের কারণে খাবার কম খেলে রক্তে শর্করা অস্বাভাবিকভাবে কমেও যেতে পারে।

তাই অসুস্থ অবস্থায় নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা এবং পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ। ওষুধ বা ইনসুলিন নিজে থেকে বন্ধ না করে প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে।

জ্বরের সময় পর্যাপ্ত বিশ্রামও জরুরি। অসুস্থ অবস্থায় শিশুদের স্কুলে পাঠানো কিংবা বড়দের বাইরে কাজ করতে যাওয়ার কারণে নিজের পাশাপাশি অন্যদের মধ্যেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ফ্লু থেকে বাঁচতে কী করবেন?

মৌসুম পরিবর্তনের সময় ফ্লুর প্রকোপ বাড়তে পারে। এ সময় বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের অতিরিক্ত ভিড়ের জায়গা, গণপরিবহন কিংবা সংক্রমণের আশঙ্কা বেশি এমন স্থান এড়িয়ে চলা ভালো।

প্রয়োজনে বাইরে মাস্ক ব্যবহার করা যেতে পারে। বাইরে থেকে ফিরে সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাস করতে হবে। হাঁচি-কাশির সময় মুখ ও নাক ঢেকে রাখা জরুরি।

বাড়িতে কেউ ফ্লুতে আক্রান্ত হলে তাঁর ব্যবহৃত জিনিসপত্র স্পর্শ করার পর হাত পরিষ্কার করতে হবে। সম্ভব হলে আক্রান্ত ব্যক্তিকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও আলাদা থাকার সুযোগ দেওয়া উচিত।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগুলোর একটি হলো ফ্লুর টিকা। বিশেষ করে বয়স্ক ও জটিলতার ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিবছর ফ্লুর টিকা নেওয়ার কথা বিবেচনা করা উচিত।

মনে রাখতে হবে, বেশির ভাগ ফ্লু কয়েক দিনের মধ্যেই সেরে যায়। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে এই পরিচিত ভাইরাসই বড় ধরনের জটিলতার কারণ হতে পারে। তাই অযথা আতঙ্ক নয়, আবার অবহেলাও নয়। শরীরের উপসর্গ ও পরিবর্তনগুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

You may also like

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *