জনপ্রিয় কোনো কৌশল মানেই যে তা সবার জন্য নিরাপদ, এমন নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়া শরীরের জন্য স্বাভাবিক ও উপকারী হলেও ঘুমের সময় মুখ আটকে রাখার জন্য টেপ ব্যবহারের কার্যকারিতা নিয়ে এখনো পর্যাপ্ত শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
মাউথ টেপিং আসলে কী?
মাউথ টেপিংয়ের ক্ষেত্রে ঘুমানোর আগে ঠোঁটের ওপর বিশেষ ধরনের টেপ লাগানো হয়। উদ্দেশ্য হলো ঘুমের মধ্যে মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ কমিয়ে নাক দিয়ে শ্বাস নিতে উৎসাহিত করা।
নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়ার বেশ কিছু স্বাভাবিক সুবিধা রয়েছে। নাক শ্বাস নেওয়ার সময় বাতাসকে আর্দ্র ও পরিশোধিত করতে সাহায্য করে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে মুখ বন্ধ করে নাক দিয়ে শ্বাস নিতে বাধ্য করলেই ঘুমের মান নিশ্চিতভাবে ভালো হবে। কারণ, কারও নাক দিয়ে স্বাভাবিকভাবে বাতাস চলাচল না করলে মুখ হয়ে উঠতে পারে শরীরের বিকল্প শ্বাসপথ।
বৈজ্ঞানিক প্রমাণ কতটা?
মাউথ টেপিং নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের দাবি দেখা গেলেও এ বিষয়ে গবেষণা এখনো সীমিত। বিশেষ করে এটি নিয়মিত ব্যবহার করলে ঘুমের মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয় বা নাক ডাকা নিশ্চিতভাবে কমে এমন শক্ত প্রমাণ নেই।
একজন ব্যক্তি মাউথ টেপিং করে ভালো ঘুম পাচ্ছেন বলে অন্য সবার ক্ষেত্রেও একই ফল হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও ঠিক নয়। কারণ মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার পেছনে ব্যক্তিভেদে ভিন্ন কারণ থাকতে পারে।
নাক বন্ধ থাকলে বিপদ হতে পারে
মাউথ টেপিংয়ের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো নাক দিয়ে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল না করা। কারও যদি দীর্ঘদিন নাক বন্ধ থাকে, অ্যালার্জির সমস্যা থাকে, নাকের ভেতরে কোনো বাধা থাকে কিংবা অন্য কোনো কারণে নাক দিয়ে সহজে শ্বাস নিতে না পারেন, তাহলে মুখে টেপ লাগিয়ে ঘুমানো সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
ঘুমের মধ্যে নাক বন্ধ হয়ে গেলে শরীর স্বাভাবিকভাবেই মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ঠোঁটে টেপ লাগানো থাকলে সেই বিকল্প পথও সীমিত হয়ে যায়। তাই নাক দিয়ে শ্বাস নিতে সমস্যা থাকা অবস্থায় নিজের সিদ্ধান্তে মাউথ টেপিং শুরু করা উচিত নয়।
নাক ডাকা কমাতে কি এটি কাজ করে?
নাক ডাকার কারণ একাধিক হতে পারে। কারও ক্ষেত্রে মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া এর সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও সব নাক ডাকার কারণ এক নয়।
বিশেষ করে ঘুমের মধ্যে বারবার শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া, হাঁসফাঁস করে ওঠা বা অতিরিক্ত নাক ডাকার মতো উপসর্গ থাকলে সেটি স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে শুধু মুখে টেপ লাগিয়ে নাক ডাকা বন্ধ করার চেষ্টা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
চোয়ালের আকৃতি বদলাবে এমন দাবির ভিত্তি কতটা?
মাউথ টেপিং নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও একটি দাবি রয়েছে এতে নাকি নিয়মিতভাবে মুখের গড়ন বা চোয়ালের আকৃতিতে পরিবর্তন আসে। তবে এই দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
কোনো ওয়েলনেস ট্রেন্ডের সঙ্গে জনপ্রিয় দাবি যুক্ত হলেই সেটিকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত ধরে নেওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে মুখের গঠন পরিবর্তনের মতো দাবির ক্ষেত্রে আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
কারা এড়িয়ে চলবেন?
যাদের নাক দিয়ে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে সমস্যা হয়, দীর্ঘদিন নাক বন্ধ থাকে, অ্যালার্জি রয়েছে, নাকের ভেতরে বাধা আছে কিংবা স্লিপ অ্যাপনিয়ার আশঙ্কা রয়েছে তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া মাউথ টেপিং করা উচিত নয়।
শিশুদের ক্ষেত্রেও নিজের সিদ্ধান্তে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা নিরাপদ নয়।
তাহলে মাউথ টেপিং করবেন?
মাউথ টেপিংকে একেবারে অকার্যকর বলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি এটিকে ভালো ঘুমের নিশ্চিত ও নিরাপদ উপায় হিসেবেও দেখা উচিত নয়। কারও ঘুমের সমস্যা, নিয়মিত নাক ডাকা বা মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার প্রবণতা থাকলে প্রথমে এর কারণ খুঁজে বের করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ভালো ঘুমের জন্য কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রেন্ড অনুসরণ করার আগে নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসের স্বাভাবিকতা বিবেচনা করা জরুরি। কারণ ঘুমের সময় শ্বাস নেওয়ার পথকে কৃত্রিমভাবে সীমিত করার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত আপনার নাক কি আদৌ স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেওয়ার জন্য প্রস্তুত?
স্বাস্থ্যসংক্রান্ত কোনো সমস্যা থাকলে মাউথ টেপিং শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।












