সেমাগ্লুটাইডজাতীয় ওজন কমানোর ওষুধ জনপ্রিয় হওয়ার পর আলোচনায় এসেছে ‘ওজেম্পিক ফেস’ শব্দটি। তবে কোনো তারকা এই ধরনের ওষুধ ব্যবহার করছেন শুধু চেহারার পরিবর্তন দেখে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

সেমাগ্লুটাইড কী?
সেমাগ্লুটাইড হলো একটি জিএলপি-১ রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট। এটি শরীরের স্বাভাবিক জিএলপি-১ হরমোনের মতো কাজ করে এবং ক্ষুধা ও খাদ্যগ্রহণ কমাতে সাহায্য করে। সেমাগ্লুটাইড পাকস্থলী থেকে খাবার বের হওয়ার গতিও ধীর করতে পারে, ফলে তুলনামূলক কম খাবারেই দীর্ঘসময় পেট ভরা অনুভূতি তৈরি হতে পারে।

সেমাগ্লুটাইডের বিভিন্ন ব্র্যান্ড ও ব্যবহারের উদ্দেশ্য এক নয়। উদাহরণ হিসেবে, ওজেম্পিক টাইপ-২ ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে ওয়েগোভি নির্দিষ্ট প্রাপ্তবয়স্কদের স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজনের ক্ষেত্রে ওজন কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য অনুমোদিত।
অর্থাৎ, ওজেম্পিককে সরাসরি ‘স্লিম হওয়ার ওষুধ’ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ও নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন অনুযায়ী এসব ওষুধ ব্যবহার করা হয়।
কেন মুখে আসে ‘ওজেম্পিক ফেস’?
‘ওজেম্পিক ফেস’ কোনো আনুষ্ঠানিক চিকিৎসাবিষয়ক রোগের নাম নয়। দ্রুত ওজন কমার ফলে মুখের চেহারায় যে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে, সেটিকে বোঝাতেই মূলত এই জনপ্রিয় শব্দটি ব্যবহার করা হয়।
দ্রুত ওজন কমলে শরীরের অন্যান্য অংশের মতো মুখ ও গলার নিচের ত্বকের নিচে থাকা চর্বিও কমে যেতে পারে। ফলে গাল কিছুটা বসে যাওয়া, চোখের চারপাশে বেশি ফাঁপা দেখানো, মুখের রেখা স্পষ্ট হওয়া কিংবা ত্বক কিছুটা ঢিলে হয়ে যাওয়ার মতো পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

চিকিৎসাবিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তন শুধু সেমাগ্লুটাইড ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রেই হয় না। দ্রুত ওজন কমানোর অন্য পদ্ধতি, এমনকি ব্যারিয়াট্রিক সার্জারি বা কঠোর জীবনযাপন পরিবর্তনের পরও একই ধরনের মুখের পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।
তাই ‘ওজেম্পিক ফেস’ আসলে ওষুধটির সরাসরি কোনো মুখের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয়; বরং দ্রুত ওজন কমার দৃশ্যমান ফল হিসেবে বিষয়টি বেশি পরিচিত হয়েছে।
শুধু চেহারা নয়, পেশিও কমতে পারে
দ্রুত ওজন কমার সময় শরীর থেকে শুধু চর্বিই কমে না; কিছু ক্ষেত্রে পেশির পরিমাণও কমতে পারে। এ কারণে ওজন কমানোর সময় পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ এবং শক্তিবর্ধক ব্যায়ামের গুরুত্ব রয়েছে।
তবে সেমাগ্লুটাইড ব্যবহার করলেই প্রত্যেকের উল্লেখযোগ্য পেশি ক্ষয় হবে এমন সরল সিদ্ধান্তও ঠিক নয়। ওজন কমার পরিমাণ, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কার্যক্রম, বয়স ও ব্যক্তিগত শারীরিক অবস্থার ওপর শরীরের গঠন পরিবর্তন নির্ভর করে। দ্রুত ওজন কমলে ত্বক ও পেশির ওপর পরিবর্তন তুলনামূলক বেশি দৃশ্যমান হতে পারে।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কী কী?
সেমাগ্লুটাইডজাতীয় ওষুধে বমি বমি ভাব, বমি, ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য, পেটব্যথাসহ বিভিন্ন ধরনের গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যা দেখা দিতে পারে। অনুমোদিত ওয়েগোভির তথ্যেও এসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া গুরুতর কিছু ঝুঁকির ব্যাপারেও চিকিৎসকদের সতর্ক থাকতে হয়। ওয়েগোভির অনুমোদিত তথ্য অনুযায়ী, অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ, পিত্তথলির সমস্যা, কিডনি-সংক্রান্ত জটিলতা এবং গুরুতর অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়ার মতো ঝুঁকির বিষয়ে সতর্কতা রয়েছে।
বিশেষ করে অননুমোদিত বা কম্পাউন্ড করা সেমাগ্লুটাইড ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ জানিয়েছে, এ ধরনের পণ্যের সঙ্গে ডোজ-সংক্রান্ত ভুল ও বিভিন্ন বিরূপ প্রতিক্রিয়ার রিপোর্ট পাওয়া গেছে।
ওষুধ বন্ধ করলে কি ওজন আবার বাড়ে?
ওজন কমানোর চিকিৎসাকে একবারের ‘শর্টকাট’ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। অনেকের ক্ষেত্রে ওষুধ বন্ধ করার পর হারানো ওজনের একটি অংশ আবার ফিরে আসতে পারে। এ কারণেই চিকিৎসকেরা দীর্ঘমেয়াদি ওজন নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দেন।
অর্থাৎ, শুধু দ্রুত ওজন কমানোই লক্ষ্য নয়; কমানো ওজন ধরে রাখা, পেশি সংরক্ষণ এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তারকার চেহারা দেখে সিদ্ধান্ত নয়
কোনো তারকার কয়েক মাসে ওজন কমে গেলে সেটির পেছনে সেমাগ্লুটাইড বা অন্য কোনো ওষুধ রয়েছে এমন দাবি করার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য বা নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। ছবি দেখে ওষুধ ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করা যায় না।
‘ওজেম্পিক ফেস’ নিয়ে আলোচনাও তাই হওয়া উচিত বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে। দ্রুত ওজন কমলে মুখের চর্বি কমে গিয়ে চেহারায় বয়সের ছাপ, গাল বসে যাওয়া বা ত্বক ঢিলে হওয়ার মতো পরিবর্তন আসতে পারে এটি বাস্তব। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে এমন চেহারা দেখলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ওজেম্পিক ব্যবহার করেছেন।
ওজন কমানোর জন্য প্রেসক্রিপশন ওষুধ ব্যবহার করতে হলে ব্যক্তির স্বাস্থ্যগত অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ। দ্রুত ফলের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যকর ওজন ধরে রাখা, সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত প্রোটিন এবং নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ডই গুরুত্বপূর্ণ।












