বাংলাদেশের ওটিটি ও ডিজিটাল কনটেন্টের তারকাদের নিয়ে বসেছিল পুরস্কারের জমকালো আসর। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয় ব্লেন্ডারস চয়েস-দ্য ডেইলি স্টার ওটিটি অ্যান্ড ডিজিটাল কনটেন্ট অ্যাওয়ার্ডসের পঞ্চম আয়োজন। তারকা, নির্মাতা, সংগীতশিল্পী ও কনটেন্ট নির্মাতাদের উপস্থিতিতে সন্ধ্যাটি হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। তবে এবারের আসরে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকি এবং নুহাশ হুমায়ূনের সিরিজ ‘২ষ’।
২০২৫ সালের ওটিটি কনটেন্টের জন্য নির্ধারিত ২৩টি পুরস্কারের মধ্যে ১৭টিই জিতেছে চরকি। অন্যদিকে হইচই পেয়েছে চারটি পুরস্কার। আইস্ক্রিন ও বিঞ্জের ঝুলিতে গেছে একটি করে পুরস্কার। বিভিন্ন বিভাগে চরকির এই সাফল্য এবারের আয়োজনের অন্যতম বড় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
‘২ষ’-এর দাপট, আট পুরস্কার
নুহাশ হুমায়ূনের ‘২ষ’ এবারের আসরে ছিল অন্যতম সফল কাজ। সমালোচক বিভাগে সেরা পরিচালকসহ মোট আটটি পুরস্কার জিতে নিয়েছে সিরিজটি। সেরা চিত্রগ্রহণ, সম্পাদনা, চিত্রনাট্য, শিল্প নির্দেশনা, পোশাক পরিকল্পনা, আবহসংগীত, শব্দ পরিকল্পনা ও অভিনয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগেও স্বীকৃতি পেয়েছে ‘২ষ’-এর সংশ্লিষ্টরা।
সমালোচক বিভাগে সেরা অভিনেতার পুরস্কার পেয়েছেন মোশাররফ করিম, ‘২ষ’-এ অভিনয়ের জন্য। ফলে নির্মাণ ও অভিনয়, দুই ক্ষেত্রেই সিরিজটির সাফল্য ছিল উল্লেখযোগ্য।
অভিনয়ে নিশো, মেহজাবীন ও তমার সাফল্য
জনপ্রিয় বিভাগে সেরা অভিনেতা নির্বাচিত হয়েছেন আফরান নিশো। ‘আকা’ সিরিজে অভিনয়ের জন্য এই স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি। একই বিভাগে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার উঠেছে মেহজাবীন চৌধুরীর হাতে। ‘নীলসুখ’-এ অভিনয়ের জন্য পুরস্কার পেয়েছেন এই অভিনেত্রী।

অন্যদিকে সমালোচক বিভাগে সেরা অভিনেত্রীর সম্মান পেয়েছেন তমা মির্জা। ‘আমলনামা’য় অভিনয়ের জন্য এই স্বীকৃতি অর্জন করেন তিনি। পুরস্কার বিতরণের রাতে মাকে সঙ্গে নিয়ে হাজির হয়েছিলেন তমা। তার কথায়, মনোনয়ন পেলে অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে মাকে সঙ্গে আনার চেষ্টা করেন তিনি। মাকে পাশে পেলে অনেক সময় পুরস্কারও জেতেন। এবারও সেই ব্যতিক্রম হয়নি।
পার্শ্বচরিত্রেও ছিল পরিচিত মুখের সাফল্য। জনপ্রিয় বিভাগে সেরা পার্শ্ব অভিনেতা হয়েছেন মনোজ প্রামাণিক, ‘অমীমাংসিত’-এর জন্য। সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছেন রুনা খান, ‘বোহেমিয়ান ঘোড়া’য় অভিনয়ের সুবাদে।
সেরা চলচ্চিত্র ও সিরিজের স্বীকৃতি
জনপ্রিয় বিভাগে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার জিতেছে ‘ঘুমপরী’। সেরা নাটক বা সিরিজ নির্বাচিত হয়েছে ‘বোহেমিয়ান ঘোড়া’। নাটক বা সিরিজের সেরা পরিচালকের পুরস্কার পেয়েছেন ভিকি জাহেদ, ‘আকা’র জন্য। চলচ্চিত্রের সেরা পরিচালক হয়েছেন রায়হান রাফী, ‘আমলনামা’র সুবাদে।
সমালোচক বিভাগে সেরা চলচ্চিত্র, নাটক বা সিরিজের পুরস্কার পেয়েছে ‘ফেউ’। এদিকে দর্শকের ভোটে পিপলস চয়েস অ্যাওয়ার্ড জিতেছে ‘দাগি’।
গানেও ‘ঘুমপরী’র জয়
এবারের পুরস্কার আয়োজনে সংগীত বিভাগেও সাফল্য পেয়েছে ‘ঘুমপরী’। সিরিজটির ‘প্রেমের জখম’ গানের জন্য সেরা কণ্ঠশিল্পীর পুরস্কার পেয়েছেন মাহতিম শাকিব ও সিঁথি সাহা। একই গানের সুবাদে সেরা সংগীত পরিচালক হয়েছেন জাহিদ নিরব এবং সেরা গীতিকারের পুরস্কার পেয়েছেন জাহিদ প্রীতম।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সেরা সংগীতের পুরস্কার অর্জন করেছে ঈশান মজুমদারের ‘গুলবাহার’। ফলে চলচ্চিত্র ও সিরিজের পাশাপাশি সংগীতেও বৈচিত্র্যময় কাজের স্বীকৃতি দিয়েছে এবারের আয়োজন।
ব্যক্তিগত কনটেন্ট নির্মাতাদের মধ্যেও ছিল পুরস্কার বিতরণ। তথ্যবিনোদন ও পডকাস্ট বিভাগে সেরা কনটেন্ট ক্রিয়েটর হয়েছেন সামিরস্ক্যান। ভ্রমণ, খাবার ও রেসিপি বিভাগে পুরস্কার পেয়েছেন নাদির অন দ্য গো। বহুমুখী কনটেন্ট ক্রিয়েটর বিভাগে জনপ্রিয় ও সমালোচক নির্বাচন, দুই ক্ষেত্রেই স্বীকৃতি পেয়েছেন সুনেরাহ তাসনিম এবং সৈয়দা রাশাদ ইমাম তন্ময়।
রেড কার্পেটে তারকাদের উপস্থিতি
পুরস্কার বিতরণের আগে বিকেল সাড়ে চারটায় শুরু হয় রেড কার্পেট পর্ব। সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত চলা এই আয়োজনে অংশ নেন মেহজাবীন চৌধুরী, তমা মির্জা, সুনেরাহ বিনতে কামাল, রিচি সোলায়মান, দীপা খন্দকার, সুমাইয়া শিমু, আশফাক নিপুনসহ বিনোদন অঙ্গনের অনেক পরিচিত মুখ।
কেউ এসেছিলেন একা, কেউ সঙ্গী কিংবা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে। মাকে সঙ্গে নিয়ে তমা মির্জার উপস্থিতি যেমন নজর কেড়েছে, তেমনি তারকাদের আড্ডা ও পারস্পরিক সাক্ষাৎও তৈরি করেছে উৎসবের আবহ।
মূল অনুষ্ঠান শুরু হয় জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে। এরপর একে একে ঘোষণা করা হয় বিভিন্ন বিভাগের বিজয়ীদের নাম। পুরস্কার বিতরণের ফাঁকে ছিল সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। সারিকা সাবাহ ও আলিফিয়া স্কোয়াডের উদ্বোধনী পরিবেশনার পর মঞ্চে আসেন সুনেরাহ বিনতে কামাল, ইরফান সাজ্জাদ ও মেহজাবীন চৌধুরী। সবশেষে সংগীত পরিবেশন করে বাংলা সিম্ফনি।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ইস্পাহানি গ্রুপের চেয়ারম্যান মির্জা সালমান ইস্পাহানি এবং দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম। তাঁদের বক্তব্যে বাংলাদেশের ওটিটি শিল্পের অগ্রগতি, স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে ডিজিটাল কনটেন্টের ভূমিকা গুরুত্ব পায়।
বিভিন্ন ধারার কনটেন্ট নির্মাতা ও শিল্পীদের স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে এবারের আয়োজন আবারও তুলে ধরেছে বাংলাদেশের বিনোদনশিল্পে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের ক্রমবর্ধমান প্রভাব। তবে রাতের সবচেয়ে বড় সাফল্যের গল্প হয়ে থাকল চরকির ১৭ পুরস্কার এবং ‘২ষ’-এর আটটি স্বীকৃতি।












