জিন্নাহর প্রপৌত্রী এলা ওয়াদিয়া গত বছরের লে বল-এ অংশ নিয়ে আলোচনায় আসেন। প্যারিসের শাংগ্রিলা প্যারিস হোটেলের জমকালো আয়োজনে এলিকে দেখা যায় লেবানিজ ফ্যাশন ডিজাইনার এলি সাব-এর তৈরি স্ট্র্যাপলেস গোল্ডেন গাউনে। রাজকীয় আভিজাত্যের সেই পোশাকেই আন্তর্জাতিক ফ্যাশন অঙ্গনের নজর কাড়েন তিনি।
কী এই লে বল?
লে বল দ্য ডেবুট্যান্ট বিশ্বের অন্যতম আলোচিত অভিজাত ডেবুট্যান্ট বল। প্রতিবছর প্যারিসের বিলাসবহুল শাংগ্রিলা প্যারিস হোটেলে বসে এই আয়োজন। ভবনটির ইতিহাসও বেশ সমৃদ্ধ একসময় এটি ছিল প্রিন্স রোলাঁ বোনাপার্টের বাসভবন।
সাধারণত বিশ্বের প্রভাবশালী পরিবারগুলোর ২১ বছরের কম বয়সী অল্পসংখ্যক তরুণীকে এই আয়োজনে আমন্ত্রণ জানানো হয়। রাজপরিবারের সদস্য থেকে শুরু করে বিলিয়নিয়ার পরিবারের উত্তরাধিকারী, তারকা পরিবারের সন্তান বিভিন্ন দেশের অভিজাত পরিবারের তরুণীরা এতে অংশ নেন।

আয়োজনের মূল আকর্ষণ শুধু পোশাক নয়। আনুষ্ঠানিক পরিচয়, নাচ এবং বিশেষভাবে তৈরি কতুর গাউনের মধ্য দিয়ে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের অভিষেক ঘটান। ফলে এটি একই সঙ্গে সামাজিক ও ফ্যাশন অঙ্গনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন হিসেবে পরিচিত।
জিন্নাহ পরিবারের সঙ্গে এলা ওয়াদিয়ার সম্পর্ক
এলার পারিবারিক পরিচয়ের শিকড় পৌঁছে যায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর একমাত্র সন্তান দিনা জিন্নাহর কাছে। জিন্নাহ ও তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী রুট্টেনবাই পেটিটের একমাত্র সন্তান ছিলেন দিনা। ১৯১৮ সালে তাঁদের বিয়ে হয়।
পরবর্তী সময়ে দিনা বিয়ে করেন নেভিল ওয়াদিয়াকে। ওয়াদিয়া পরিবারের সঙ্গে রুট্টেনবাইয়ের পারিবারিক সম্পর্কও ছিল। ঐতিহাসিক বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ পাওয়া যায়, দিনার এই বিয়ের কারণে তাঁর সঙ্গে বাবা জিন্নাহর সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল।
দিনা ও নেভিলের ছেলে নসলি ওয়াদিয়া পরবর্তী সময়ে ভারতের অন্যতম পরিচিত ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন এবং ওয়াদিয়া গ্রুপের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দুই ছেলে নেস ওয়াদিয়া ও জেহাঙ্গির ওয়াদিয়া। জেহাঙ্গির ওয়াদিয়ার স্ত্রী সেলিনা ওয়াদিয়া একজন ফ্যাশন ডিজাইনার। তাঁদের সন্তানই এলা ওয়াদিয়া। সেই সূত্রে এলা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর প্রপৌত্রী।
অর্থাৎ, এলার পারিবারিক পরিচয়ের সঙ্গে একদিকে জড়িয়ে আছে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা জিন্নাহর উত্তরাধিকার, অন্যদিকে রয়েছে ভারতের প্রভাবশালী ওয়াদিয়া পরিবারের ব্যবসায়িক ও সামাজিক পরিচয়।
কতুর গাউনে ঝলমলে রাত
লে বলের আয়োজনকে ঘিরে পোশাকের বিষয়টি বরাবরই বিশেষ গুরুত্ব পায়। অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কতুর ফ্যাশন হাউসের সঙ্গে কাজ করে নিজেদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি গাউন বেছে নেন। অনেক ক্ষেত্রে এসব পোশাকের মূল্যও বেশ চড়া। আয়োজনের আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে থাকে নাচ ও পরিচয়পর্ব। ঝাড়বাতির আলোয় সাজানো অভিজাত কক্ষে চলে নানা আয়োজন। আবার আইফেল টাওয়ারের দিকে মুখ করা বারান্দাও হয়ে ওঠে ছবি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট তৈরির আকর্ষণীয় জায়গা। মূল্যবান গয়না ও পোশাকের কারণে নিরাপত্তার ব্যবস্থাও থাকে কড়া। পুরো আয়োজনেই তাই ফ্যাশন, ঐতিহ্য ও আভিজাত্যের পাশাপাশি নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
গত বছরের আয়োজনে এলার পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন প্রভাবশালী পরিবারের আরও কয়েকজন তরুণী অংশ নেন। তবে এলার উপস্থিতি বিশেষভাবে নজর কাড়ে তাঁর পারিবারিক পরিচয় ও এলি সাবের সোনালি গাউনের কারণে।
লে বলের পোশাক নির্বাচনের ক্ষেত্রেও রয়েছে নির্দিষ্ট নিয়ম। অংশগ্রহণকারীদের গাউনে কালো কিংবা সাদা রং ব্যবহার করা যায় না ফলে প্রতিটি তরুণীর পোশাকে থাকে আলাদা রং, নকশা ও সৃজনশীলতার প্রকাশ।
ইতিহাসের উত্তরাধিকার, ফ্যাশনের নতুন পরিচয়
এলা ওয়াদিয়ার গল্প তাই শুধু একটি অভিজাত ফ্যাশন আয়োজনে অংশ নেওয়ার গল্প নয়। তাঁর পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একই সঙ্গে তিনি ভারতের দীর্ঘদিনের পরিচিত একটি ব্যবসায়ী পরিবারের উত্তরসূরি।
সেই ঐতিহাসিক পারিবারিক পরিচয় নিয়েই প্যারিসের আন্তর্জাতিক ফ্যাশন মঞ্চে উপস্থিত হয়েছেন এলা। ফলে তাঁর লে বল অভিষেক যেন ইতিহাস, পারিবারিক উত্তরাধিকার ও সমকালীন ফ্যাশনের তিন ভিন্ন জগতকে একই ফ্রেমে নিয়ে এসেছে।












