লাল লিপস্টিক: সাজ নাকি প্রতিবাদ?

Beauty

একটি ছোট্ট প্রসাধনী কতটা শক্তিশালী হতে পারে? আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঠোঁটে লাল রং লাগানোর মুহূর্তটিকে হয়তো নিছক সাজগোজের অংশ বলেই মনে হয়। কিন্তু এই রঙের পেছনে রয়েছে কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস। কখনো এটি ছিল ক্ষমতা ও আভিজাত্যের চিহ্ন, কখনো সামাজিক নিষেধাজ্ঞার কারণ, আবার কখনো হয়ে উঠেছে প্রতিবাদ ও আত্মপরিচয়ের ভাষা।

লাল লিপস্টিকের ইতিহাস প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো। সময়ের সঙ্গে এর উপাদান, তৈরি করার পদ্ধতি ও ব্যবহারের ধরন বদলেছে। কিন্তু একটি বিষয় বদলায়নি, লাল ঠোঁট বরাবরই মানুষের নজর কেড়েছে।

রাজকীয় সাজ থেকে শুরু

লাল ঠোঁটের প্রসাধনের প্রাচীন ইতিহাস খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় মেসোপটেমিয়ায়। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দে সুমেরীয় অভিজাতদের মধ্যে ঠোঁট রাঙানোর প্রচলনের প্রমাণ পাওয়া যায়। রাজপরিবার ও উচ্চবিত্ত নারীদের সাজসজ্জায় বিভিন্ন খনিজ ও রঞ্জক পদার্থ ব্যবহার করা হতো।

মেসোপটেমিয়ার পাশাপাশি প্রাচীন মিসরেও ঠোঁট রাঙানোর চল ছিল। মিসরের রাজপরিবার ও অভিজাত নারীদের প্রসাধনে বিভিন্ন প্রাকৃতিক রঞ্জক ব্যবহার করা হতো। ক্লিওপেট্রার সৌন্দর্যচর্চার সঙ্গে লাল ঠোঁটের গল্পও ইতিহাস ও জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত।

তখনকার সময়ে প্রসাধন ছিল শুধু সৌন্দর্য বাড়ানোর বিষয় নয়। সামাজিক অবস্থান, সম্পদ ও ক্ষমতার প্রকাশের সঙ্গেও এর সম্পর্ক ছিল।

কখনো সৌন্দর্য, কখনো নিষেধ

লাল ঠোঁটের সামাজিক অর্থ সব যুগে এক ছিল না। প্রাচীন গ্রিসে নির্দিষ্ট সামাজিক গোষ্ঠীর সঙ্গে লাল ঠোঁটের ব্যবহারকে যুক্ত করা হয়েছিল। ফলে একই প্রসাধন এক সমাজে মর্যাদার প্রতীক হলেও অন্য সমাজে তা সামাজিক অবস্থান বা নৈতিকতার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

রোমান যুগে আবার লাল ঠোঁট অভিজাত নারীদের সাজের অংশ হয়ে ওঠে। তবে প্রাচীন প্রসাধনীতে ব্যবহৃত কিছু উপাদান ছিল স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক। অর্থাৎ সৌন্দর্যের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে ঝুঁকিও ছিল সেই সময়ের প্রসাধনচর্চায়।

মধ্যযুগে বদলে গেল দৃষ্টিভঙ্গি

ইউরোপের মধ্যযুগে ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের প্রভাবে প্রসাধন ব্যবহারের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়। স্বাভাবিক সৌন্দর্য পরিবর্তনের চেষ্টা অনেকের কাছেই অনুচিত বলে বিবেচিত হতো।

তবে সময়ের সঙ্গে সেই ধারণা বদলাতে শুরু করে। ইংল্যান্ডের রানি প্রথম এলিজাবেথের সময় ফ্যাকাশে মুখের সঙ্গে গাঢ় লাল ঠোঁট রাজকীয় সাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে। রানি নিজেও উজ্জ্বল ঠোঁটের জন্য পরিচিত ছিলেন।

এরপরও লাল প্রসাধন নিয়ে কুসংস্কার ও সামাজিক ভয় পুরোপুরি কাটেনি। ইউরোপের বিভিন্ন সময়ে মেকআপ ব্যবহারকে প্রতারণা, অনৈতিকতা এমনকি জাদুবিদ্যার সঙ্গেও যুক্ত করা হয়েছে।

ভোটাধিকার আন্দোলনে লাল ঠোঁট

বিশ শতকে এসে লাল লিপস্টিকের গল্পে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি ঘটে। নারীর ভোটাধিকার আন্দোলনের সময় লাল ঠোঁট হয়ে ওঠে আত্মবিশ্বাস ও স্বাধীনতার দৃশ্যমান প্রতীক।

১৯১২ সালে নিউইয়র্কের নারীদের ভোটাধিকার আন্দোলনের মিছিলের সঙ্গে লাল লিপস্টিকের ব্যবহার বিশেষভাবে আলোচিত হয়। প্রসাধনী উদ্যোক্তা এলিজাবেথ আর্ডেন নারী আন্দোলনকারীদের লাল লিপস্টিক সরবরাহ করেছিলেন বলেও ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায়।

এর ফলে লাল ঠোঁট ধীরে ধীরে শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক থাকেনি। নারীর নিজের শরীর ও নিজের পরিচয় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার প্রকাশের সঙ্গেও এটি যুক্ত হতে থাকে।

যুদ্ধের সময় লাল রঙের অন্য অর্থ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লাল লিপস্টিকের সঙ্গে যুক্ত হয় দেশপ্রেম ও মনোবলের বার্তা। যুদ্ধের কঠিন সময়ে প্রসাধনও মানুষের মানসিক দৃঢ়তার অংশ হয়ে উঠেছিল।

সে সময় বিভিন্ন প্রসাধনী ব্র্যান্ড উজ্জ্বল লাল রঙের লিপস্টিক বাজারে আনে। ‘ভিক্টরি রেড’ কিংবা ‘ফাইটিং রেড’-এর মতো নামও জনপ্রিয় হয়। নারীদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ এবং যুদ্ধকালীন ভূমিকার সঙ্গে এই উজ্জ্বল ঠোঁটের সাজ নতুন এক প্রতীকী অর্থ তৈরি করে।

হলিউডে লাল ঠোঁটের জয়

যুদ্ধের পর লাল লিপস্টিক প্রবেশ করে জনপ্রিয় সংস্কৃতির কেন্দ্রে। হলিউডের তারকারা একে গ্ল্যামার ও নারীত্বের অন্যতম পরিচয় বানিয়ে ফেলেন। মেরিলিন মনরো থেকে অড্রে হেপবার্ন, পরবর্তী সময়ে অসংখ্য তারকা লাল ঠোঁটকে নিজেদের স্টাইলের অংশ করেছেন।

আধুনিক সময়ে টেলর সুইফটের মতো তারকারাও লাল লিপস্টিককে নিজেদের স্বাক্ষরধর্মী সাজের অংশ করেছেন। ফলে লাল ঠোঁট কখনো রেট্রো গ্ল্যামার, কখনো আধুনিক মিনিমালিজম, আবার কখনো ব্যক্তিত্ব প্রকাশের উপায় হয়ে উঠেছে।

প্রতিবাদের ভাষাতেও লাল

লাল লিপস্টিকের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতীকী ব্যবহারও থেমে নেই। বিভিন্ন দেশে নারীর অধিকার, যৌন সহিংসতার প্রতিবাদ কিংবা কর্তৃত্ববাদবিরোধী আন্দোলনে লাল ঠোঁট ব্যবহার করা হয়েছে প্রতীক হিসেবে।

এখানেই লাল লিপস্টিকের ইতিহাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি। একই রং কখনো সৌন্দর্য, কখনো ক্ষমতা, আবার কখনো প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছে।

কয়েক হাজার বছর পরও কেন এত জনপ্রিয়?

আজকের লিপস্টিক আর প্রাচীনকালের প্রসাধনের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। আধুনিক প্রসাধনীতে রয়েছে অসংখ্য শেড, ফর্মুলা ও ফিনিশ। ম্যাট, স্যাটিন, ক্রিমি কিংবা লিকুইড, লাল লিপস্টিক এখন নানা রূপে পাওয়া যায়।

তবু এর আবেদন কমেনি। কারণ লাল এমন একটি রং, যা সহজেই নজর কাড়ে। খুব সাধারণ পোশাকের সঙ্গেও একটি লাল লিপস্টিক পুরো সাজের চরিত্র বদলে দিতে পারে। কখনো এটি গ্ল্যামার বাড়ায়, কখনো ব্যক্তিত্বকে আরও দৃঢ় করে তোলে।

আসলে লাল লিপস্টিকের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বহুমাত্রিকতায়। একই রং একজনের কাছে সাজ, অন্যজনের কাছে আত্মবিশ্বাস, আবার কারও কাছে প্রতিবাদের প্রতীক হতে পারে।

মেসোপটেমিয়ার প্রাচীন রঞ্জক থেকে আজকের আধুনিক লিপস্টিক, দীর্ঘ এই যাত্রায় পৃথিবী বদলেছে, বদলেছে সৌন্দর্যের সংজ্ঞাও। কিন্তু ঠোঁটের সেই গাঢ় লাল রং এখনো নিজের মতো করে একটি বার্তা দেয়।

সেটি হতে পারে সৌন্দর্যের, আত্মবিশ্বাসের কিংবা নিছক নিজের পছন্দের। আর সম্ভবত এ কারণেই কয়েক হাজার বছর পরও লাল লিপস্টিকের গল্প শেষ হয়নি।

 

You may also like

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *