সৌন্দর্যচর্চার জগতে নতুন নতুন প্রযুক্তি আসছে প্রতিনিয়ত। কখনো অস্ত্রোপচার ছাড়াই মুখের গড়ন বদলানো, কখনো শরীরের নির্দিষ্ট অংশে বাড়তি ভরাটভাব আনা সবকিছুতেই যেন কম সময়ে দৃশ্যমান পরিবর্তনের চাহিদা বাড়ছে। এরই মধ্যে আলোচনায় এসেছে এমন এক ধরনের ফিলার, যার কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে দান করা মানবদেহের টিস্যু।
নাম অ্যালোক্লে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান টাইগার অ্যাসথেটিকসের তৈরি এই ফিলার প্রচলিত কিছু ফিলারের মতো হায়ালুরোনিক অ্যাসিডনির্ভর নয়। বরং এতে ব্যবহার করা হয় দান করা মানবদেহের চর্বিযুক্ত টিস্যু, যা বিশেষ প্রক্রিয়ায় পরিশোধন ও জীবাণুমুক্ত করে ব্যবহারযোগ্য করা হয়।

বিষয়টি শুনতে অস্বস্তিকর লাগলেও এর পেছনে রয়েছে একটি নির্দিষ্ট চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি অ্যালোক্লেকে ঘিরে সামনে এসেছে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—দাতার সম্মতি কতটা স্পষ্ট ছিল, মানব টিস্যু সৌন্দর্যবর্ধক পণ্যে ব্যবহার কতটা গ্রহণযোগ্য এবং দীর্ঘমেয়াদে এর নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত?
মৃতদেহ থেকে কীভাবে তৈরি হয় এই ফিলার?
অ্যালোক্লের কাঁচামাল সরাসরি মৃতদেহ থেকে নিয়ে মানুষের শরীরে প্রয়োগ করা হয় না। মৃত্যুর আগে যাঁরা টিস্যু দানের সম্মতি দিয়ে যান, তাঁদের দেহ থেকে নির্দিষ্ট টিস্যু সংগ্রহ করা হয় নিয়ন্ত্রিত টিস্যু ব্যাংকের মাধ্যমে।
এর আগে দাতার চিকিৎসার ইতিহাস পর্যালোচনা এবং বিভিন্ন সংক্রামক রোগের পরীক্ষা করা হয়। এরপর ত্বকের নিচের স্তর থেকে চর্বিযুক্ত টিস্যু সংগ্রহ করা হয়।
এই টিস্যুতে থাকা দাতার জীবন্ত কোষ, রক্ত এবং অন্যান্য বংশগত উপাদান সরিয়ে ফেলা হয়। পাশাপাশি চর্বির তেলজাতীয় অংশও কমানো হয়। এরপর টিস্যুর ত্রিমাত্রিক কাঠামো যতটা সম্ভব অক্ষুণ্ন রেখে সেটিকে প্রক্রিয়াজাত করা হয় এবং শেষ ধাপে জীবাণুমুক্ত করা হয়।
অর্থাৎ, ফিলারে মৃত মানুষের টিস্যু থাকলেও সেটি কোনোভাবেই অপরিবর্তিত মৃত টিস্যু নয়। দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সেটিকে এমন একটি কাঠামোয় পরিণত করা হয়, যা শরীরে ব্যবহার করা যায়।
শরীরে গিয়ে কী করে অ্যালোক্লে?
অ্যালোক্লেকে সহজভাবে বোঝাতে গেলে এটি অনেকটা একটি ‘কাঠামো’ বা ‘স্ক্যাফোল্ড’-এর মতো কাজ করে। এটি শরীরে গিয়ে জীবন্ত চর্বিতে পরিণত হয় না।

ফিলারটি শরীরের নির্দিষ্ট স্থানে দেওয়ার পর রোগীর নিজের কোষ ও রক্তনালি ধীরে ধীরে ওই কাঠামোর মধ্যে প্রবেশ করতে পারে। এরপর শরীর সেখানে নতুন টিস্যু ও কোলাজেন তৈরি করতে পারে।
ফলে সময়ের সঙ্গে ওই অংশে ভরাটভাব তৈরি হয়। অর্থাৎ, এটি শুধু বাইরে থেকে কোনো জায়গা ফুলিয়ে দেওয়ার পদ্ধতি নয়; বরং শরীরের নিজস্ব টিস্যু তৈরির প্রক্রিয়াকে সহায়তা করার ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
কোন কোন জায়গায় ব্যবহার করা হচ্ছে?
অ্যালোক্লের ব্যবহার মূলত শরীরের আকৃতি ও অসমতা সংশোধনের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশেষ করে যেসব জায়গায় বাড়তি ভরাটভাব প্রয়োজন, সেখানে এটি ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে।
কোমর ও নিতম্বের মাঝামাঝি অংশের স্বাভাবিক গর্ত কিছুটা ভরাট করা, নিতম্বের আকৃতিতে পরিবর্তন আনা কিংবা শরীরের কোনো অসমান অংশ মসৃণ করার ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করা হতে পারে।
এ ছাড়া আগের কোনো চর্বি অপসারণের অস্ত্রোপচারের পর শরীরে তৈরি হওয়া অসমান অংশও কিছু ক্ষেত্রে ঠিক করার জন্য এমন ফিলার ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে। স্তনের সামান্য আকৃতি পরিবর্তন বা দুই পাশের অসমতা কমানোর ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
তবে শরীরের কোন অংশে, কী পরিমাণে এবং কোন রোগীর ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করা হবে—তা চিকিৎসকের মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে।
অস্ত্রোপচার ছাড়াই আকৃতি বদলানোর আগ্রহ
অ্যালোক্লেকে ঘিরে আগ্রহের একটি বড় কারণ এর প্রয়োগপদ্ধতি। নিজের শরীরের চর্বি ব্যবহার করে কোনো অংশের আকৃতি পরিবর্তন করতে হলে সাধারণত শরীরের অন্য জায়গা থেকে চর্বি সংগ্রহ করতে হয়। এর জন্য আলাদা একটি অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয়।
অ্যালোক্লের ক্ষেত্রে নিজের শরীর থেকে চর্বি সংগ্রহের প্রয়োজন নেই। ফলে চর্বি অপসারণের ওই অতিরিক্ত অস্ত্রোপচারও এড়ানো সম্ভব হতে পারে।
এ কারণে যাঁদের শরীরে পর্যাপ্ত চর্বি নেই, তাঁদের মধ্যে এই ধরনের পদ্ধতি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ওজন কমানোর পর শরীরের বিভিন্ন অংশে ভরাটভাব কমে যাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
তবে ‘কম আক্রমণাত্মক’ মানেই ঝুঁকিমুক্ত এমনটা ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
ঝুঁকি কতটা?
যেকোনো ধরনের ইনজেকশনভিত্তিক সৌন্দর্যচর্চার মতো অ্যালোক্লের ক্ষেত্রেও কিছু ঝুঁকি রয়েছে।
ফিলার দেওয়ার পর কোনো অংশে পর্যাপ্ত রক্ত সরবরাহ না হলে টিস্যুর ক্ষতি হতে পারে। এতে শক্ত বা ব্যথাযুক্ত গুটি তৈরি হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা চিকিৎসার মাধ্যমে অপসারণের প্রয়োজনও হতে পারে।
ইনজেকশনের জায়গায় সংক্রমণ হতে পারে। আবার ফিলার নির্দিষ্ট জায়গা থেকে সরে গিয়ে অসমভাবে বসলে শরীরের দুই পাশের আকৃতিতে পার্থক্য তৈরি হতে পারে।
এ কারণে প্রক্রিয়ার পর চিকিৎসকের দেওয়া নির্দেশনা মেনে চলাও গুরুত্বপূর্ণ। কিছু ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহ সরাসরি সংশ্লিষ্ট অংশের ওপর চাপ না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হতে পারে।
আরও বড় বিষয় হলো দীর্ঘমেয়াদি তথ্যের সীমাবদ্ধতা। অ্যালোক্লে নিয়ে প্রাথমিক গবেষণা ও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা থাকলেও শরীরের বড় অংশের আকৃতি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বহু বছর পর এর নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা কেমন থাকবে, সে বিষয়ে আরও তথ্য প্রয়োজন।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-দাতার সম্মতি
অ্যালোক্লেকে ঘিরে বিতর্কের জায়গাটি শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞান নয়, নৈতিকতাও।
মানুষ সাধারণত টিস্যু বা অঙ্গ দান করেন চিকিৎসা ও মানবকল্যাণের উদ্দেশ্যে। কারও দান করা টিস্যু যদি পরে সৌন্দর্যবর্ধক পণ্য তৈরিতে ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেই ব্যবহারের বিষয়টি দাতা কতটা জানতেন এ প্রশ্ন সামনে আসছে।
একজন ব্যক্তি মৃত্যুর আগে টিস্যু দানের সম্মতি দিতে পারেন। কিন্তু সেই সম্মতির আওতায় কি সৌন্দর্যচর্চায় ব্যবহারের বিষয়টিও ছিল? নাকি তাঁর ধারণা ছিল, টিস্যুটি শুধু চিকিৎসার প্রয়োজনেই ব্যবহৃত হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে শুধু চিকিৎসা প্রযুক্তির বিষয় নেই; রয়েছে মানুষের দেহ, মৃত্যুর পর দেহের প্রতি সম্মান এবং সম্মতির পরিধির মতো নৈতিক বিষয়ও।
মানব টিস্যু যখন বাণিজ্যিক পণ্য
আরেকটি প্রশ্ন অর্থনৈতিক।
একজন ব্যক্তি মানবিক উদ্দেশ্যে টিস্যু দান করলেন। সেই টিস্যু প্রক্রিয়াজাত হয়ে পরে একটি বাণিজ্যিক সৌন্দর্যপণ্য হিসেবে বাজারে এল। সেই পণ্য আবার ভোক্তার শরীরে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং এর জন্য বড় অঙ্কের অর্থ নেওয়া হচ্ছে।
এখানেই প্রশ্ন উঠছে মানবদেহ থেকে পাওয়া উপাদানকে বাণিজ্যিক সৌন্দর্যপণ্যে পরিণত করার ক্ষেত্রে কী ধরনের নৈতিক ও আইনি কাঠামো থাকা উচিত?
এই বিতর্কের সঙ্গে দাতার সম্মতি, টিস্যুর ব্যবহার, বাণিজ্যিক মূল্য এবং ভোক্তার জানার অধিকার—সবকিছুই জড়িয়ে আছে।
নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা
যুক্তরাষ্ট্রে মানব কোষ ও টিস্যুভিত্তিক কিছু পণ্য নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর আওতায় পড়ে। তবে এই ধরনের পণ্যের নিয়ন্ত্রণ সবসময় প্রচলিত ওষুধ বা চিকিৎসা সরঞ্জামের অনুমোদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে এক নয়।
ফলে কোনো পণ্য বাজারে আসার আগে ঠিক কতটা পরীক্ষা হয়েছে, তার নিরাপত্তা সম্পর্কে কী ধরনের তথ্য রয়েছে এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের প্রমাণ কতটা শক্তিশালী এসব বিষয় ভোক্তার জানা প্রয়োজন।
বিশেষ করে সৌন্দর্যচর্চার ক্ষেত্রে অনেক সময় ‘নতুন’, ‘কম আক্রমণাত্মক’ বা ‘প্রাকৃতিক’ শব্দগুলো মানুষের আগ্রহ বাড়ায়। কিন্তু এসব শব্দ কোনো চিকিৎসাপদ্ধতিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঝুঁকিমুক্ত প্রমাণ করে না।
মৃত টিস্যু কি শরীরে জীবন্ত হয়ে যায়?
অ্যালোক্লেকে ঘিরে সবচেয়ে সাধারণ ভুল ধারণাগুলোর একটি হতে পারে মৃত মানুষের টিস্যু শরীরে গিয়ে আবার জীবন্ত হয়ে যায় কি না।
এর উত্তর হলো, না।
অ্যালোক্লের উদ্দেশ্য মৃত টিস্যুকে জীবন্ত করে তোলা নয়। বরং প্রক্রিয়াজাত টিস্যুর কাঠামো শরীরে একটি ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এরপর রোগীর নিজের কোষ, রক্তনালি ও টিস্যু সেই কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে এবং নতুন টিস্যু তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
অর্থাৎ, শেষ পর্যন্ত যে টিস্যু তৈরি হয়, তার বড় অংশই রোগীর নিজের শরীরের তৈরি।
সৌন্দর্যের নতুন প্রযুক্তি, নাকি আরও কিছু প্রশ্নের শুরু?
সৌন্দর্যচর্চার জগতে প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষের সামনে নতুন অনেক সুযোগ তৈরি করছে। অ্যালোক্লেও সেই ধারার একটি উদাহরণ। অস্ত্রোপচার ছাড়াই শরীরের নির্দিষ্ট অংশে কাঙ্ক্ষিত ভরাটভাব আনার সম্ভাবনা এ ধরনের প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ বাড়াচ্ছে।
তবে এর পাশাপাশি কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর আরও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন দাতার সম্মতি কতটা নির্দিষ্ট ছিল, মানব টিস্যুর বাণিজ্যিক ব্যবহার কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদে এর নিরাপত্তা কতটা প্রমাণিত এবং সম্ভাব্য জটিলতা দেখা দিলে তার চিকিৎসা কীভাবে করা হবে।
তাই অ্যালোক্লের মতো নতুন কোনো ফিলার ব্যবহারের আগে শুধু কাঙ্ক্ষিত সৌন্দর্য পরিবর্তনের দিকটি দেখলেই হবে না। এর উপকারিতা, সম্ভাব্য ঝুঁকি, দীর্ঘমেয়াদি তথ্য এবং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সম্পর্কে চিকিৎসকের কাছ থেকে বিস্তারিত জেনে সিদ্ধান্ত নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।












