সকালে ঘুম ভাঙতেই পিঠে ব্যথা?

Health

রাতে পর্যাপ্ত ঘুমানোর পরও সকালে ঘুম থেকে উঠে পিঠে ব্যথা কিংবা কোমরে শক্তভাব অনুভব করছেন? অনেকেই এমন সমস্যাকে ঘুমের ভুল ভঙ্গি বা বিছানার অসুবিধা ভেবে এড়িয়ে যান। কিন্তু নিয়মিত এমনটা হলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়। দৈনন্দিন অভ্যাসের পাশাপাশি মেরুদণ্ডের সমস্যা কিংবা কিছু দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অবস্থার কারণেও সকালে পিঠে ব্যথা হতে পারে।

স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট মেডিকেল নিউজ টুডের এক প্রতিবেদনে সকালে পিঠে ব্যথা হওয়ার সাতটি সম্ভাব্য কারণ, ব্যথা কমানোর উপায় এবং কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন, তা তুলে ধরা হয়েছে।

১. মেরুদণ্ডের ডিস্কে ক্ষয়

মেরুদণ্ডের হাড়গুলোর মাঝখানে থাকা ডিস্ক শরীরের ভার বহন ও নড়াচড়ার সময় চাপ সামলাতে সাহায্য করে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব ডিস্কে ক্ষয়জনিত পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ডিস্কের পরিবর্তনের সঙ্গে স্নায়ুতে চাপ পড়লে পিঠ বা কোমরে ব্যথা, অসাড়তা কিংবা নড়াচড়ায় অসুবিধা হতে পারে।

দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা, সামনে ঝুঁকে কাজ করা কিংবা ভারী জিনিস তোলার সময় ব্যথা বেড়ে যেতে পারে। তবে সকালে পিঠে ব্যথা হলেই ডিস্কের ক্ষয় হয়েছে, এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

২. ফাইব্রোমায়ালজিয়া

ফাইব্রোমায়ালজিয়া একটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা, যাতে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যথা ও স্পর্শকাতরতা দেখা দিতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তিদের ঘুম থেকে ওঠার পর শরীর শক্ত লাগা, ক্লান্তি, ঘুমের সমস্যা এবং মনোযোগ ধরে রাখতে অসুবিধা হতে পারে।

শুধু পিঠে ব্যথা দিয়ে ফাইব্রোমায়ালজিয়া শনাক্ত করা যায় না। শরীরের বিভিন্ন উপসর্গের ধরন ও স্থায়িত্ব বিবেচনা করে চিকিৎসক এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন।

৩. অতিরিক্ত ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রম

দীর্ঘ সময় ব্যায়াম করা, ভারী জিনিস তোলা কিংবা হঠাৎ কঠিন শারীরিক কাজে যুক্ত হলে পিঠের পেশিতে অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। এর ফলে পরদিন সকালে ব্যথা বা পেশিতে টান অনুভূত হতে পারে।

এ ধরনের অস্বস্তি কমাতে ব্যায়ামের আগে শরীর গরম করে নেওয়া, ধীরে ধীরে ব্যায়ামের মাত্রা বাড়ানো এবং শরীরের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করা জরুরি। ব্যায়ামের সময় সঠিক কৌশল অনুসরণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।

৪. বিছানা থেকে হঠাৎ উঠে পড়া

ঘুম থেকে উঠেই দ্রুত উঠে বসা কিংবা কোমর বাঁকিয়ে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লে পিঠের পেশিতে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে আগে থেকেই কোমরে ব্যথা থাকলে এমন নড়াচড়ায় সমস্যা বাড়তে পারে।

তাই ঘুম ভাঙার পর প্রথমে ধীরে পাশ ফিরে শুয়ে থাকা অবস্থান থেকে উঠে বসুন। এরপর পা মেঝেতে রেখে ধীরে দাঁড়ান। ব্যথা থাকলে জোর করে শরীর বাঁকানো বা দ্রুত উঠে পড়া এড়িয়ে চলুন।

৫. ঘুমানোর ভুল ভঙ্গি

ঘুমের সময় শরীরের অবস্থান আরামদায়ক না হলে কোমর, পিঠ ও ঘাড়ে চাপ পড়তে পারে। এর প্রভাব সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর ব্যথা বা শক্তভাব হিসেবে দেখা দিতে পারে।

চিত হয়ে ঘুমানোর সময় হাঁটুর নিচে একটি বালিশ রাখা এবং কাত হয়ে ঘুমানোর সময় দুই হাঁটুর মাঝে বালিশ রাখা অনেকের ক্ষেত্রে আরাম দিতে পারে। তবে সবার জন্য একই ভঙ্গি উপযুক্ত নয়। যে অবস্থানে মেরুদণ্ড আরামদায়ক থাকে এবং ব্যথা বাড়ে না, সেটি বেছে নেওয়া ভালো।

৬. শরীরের সঙ্গে মানানসই নয় এমন তোশক

অতিরিক্ত নরম, দেবে যাওয়া কিংবা শরীরকে পর্যাপ্ত সমর্থন দিতে পারে না, এমন তোশকে ঘুমালে কারও কারও পিঠে অস্বস্তি হতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ব্যবহারে তোশক অসমান হয়ে গেলে ঘুমের আরাম ব্যাহত হতে পারে।

তোশক বাছাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু নরম বা শক্ত হওয়ার বিষয়টি নয়, শরীরের জন্য কতটা আরামদায়ক এবং পিঠকে যথাযথ সমর্থন দিচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন। তবে তোশক পরিবর্তন করলেই সব ধরনের পিঠব্যথা সেরে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

৭. গর্ভাবস্থা

গর্ভাবস্থায় পিঠ ও কোমরে ব্যথা হওয়া বেশ পরিচিত সমস্যা। এ সময় হরমোনের পরিবর্তনে লিগামেন্ট ও জয়েন্টে শিথিলতা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি শিশুর বৃদ্ধি ও শরীরের ভারকেন্দ্রের পরিবর্তনের কারণে পিঠের পেশি ও মেরুদণ্ডে চাপ বাড়তে পারে।

এ সময় আরামদায়ক ভঙ্গিতে বিশ্রাম নেওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিরাপদ শারীরিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া উপকারী হতে পারে। ব্যথা তীব্র হলে, নিয়মিত বাড়তে থাকলে কিংবা অন্য কোনো উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

সকালে পিঠের ব্যথা কমাতে কী করবেন?

ঘুম থেকে ওঠার পর হালকা ব্যথা বা শক্তভাব অনুভূত হলে কয়েকটি অভ্যাস উপকার দিতে পারে।

  • ধীরে নড়াচড়া করুন: বিছানা থেকে হঠাৎ উঠে না পড়ে ধীরে বসুন ও দাঁড়ান।
  • হালকা হাঁটাচলা করুন: সহনীয় মাত্রায় নড়াচড়া পেশির জড়তা কমাতে সাহায্য করতে পারে। ব্যথা বাড়লে থামুন।
  • গরম বা ঠান্ডা সেঁক দিন: কাপড়ে মোড়ানো হিট প্যাক বা ঠান্ডা প্যাক অল্প সময় ব্যবহার করলে আরাম মিলতে পারে। সরাসরি ত্বকে বরফ বা অতিরিক্ত গরম প্যাক লাগাবেন না।
  • ঘুমের পরিবেশ ঠিক রাখুন: আরামদায়ক বালিশ ও শরীরকে যথাযথ সমর্থন দেয় এমন তোশক ব্যবহার করুন।
  • ভারী কাজের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকুন: ব্যথা থাকা অবস্থায় হঠাৎ ভারী জিনিস তোলা বা অতিরিক্ত চাপের ব্যায়াম এড়িয়ে চলুন।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

পিঠের ব্যথা কয়েক সপ্তাহ ধরে থাকলে, বারবার ফিরে এলে কিংবা দৈনন্দিন কাজ ও ঘুমে বাধা সৃষ্টি করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ব্যথার প্রকৃত কারণ নির্ণয় করতে উপসর্গের ধরন, শারীরিক পরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য পরীক্ষা লাগতে পারে।

তবে কিছু লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা করা ঠিক নয়। পিঠব্যথার সঙ্গে প্রস্রাব বা পায়খানা নিয়ন্ত্রণে নতুন সমস্যা, যৌনাঙ্গ বা নিতম্বের মাঝের অংশে অসাড়তা কিংবা পায়ে নতুন বা বাড়তে থাকা দুর্বলতা দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে। বড় ধরনের আঘাতের পর ব্যথা শুরু হলেও দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন। একইভাবে বুকব্যথা বা শ্বাসকষ্টের সঙ্গে পিঠে ব্যথা হলে জরুরি বিভাগে যেতে হবে।

সকালে পিঠে ব্যথা মানেই গুরুতর অসুস্থতা নয়। ঘুমের ভঙ্গি কিংবা পেশিতে চাপ পড়ার মতো সাধারণ কারণেও এমন হতে পারে। তবে ব্যথা নিয়মিত হলে বা অন্য উপসর্গের সঙ্গে দেখা দিলে কারণ খুঁজে বের করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

You may also like

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *