হলিউডের করপোরেট ইতিহাসে যুক্ত হলো নতুন এক অধ্যায়। প্রায় ১১১ বিলিয়ন ডলারের চুক্তিতে ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারিকে অধিগ্রহণ সম্পন্ন করেছে প্যারামাউন্ট স্কাইড্যান্স। ৬ অক্টোবর চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পর নতুন যৌথ প্রতিষ্ঠানের নাম রাখা হয়েছে স্কাইড্যান্স করপোরেশন। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ডেভিড এলিসন। সহপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে থাকছেন ইয়োন ক্রেইজ।
এই অধিগ্রহণের মধ্য দিয়ে বিশ্বের পরিচিত দুটি বিনোদন সাম্রাজ্যের চলচ্চিত্র স্টুডিও, টেলিভিশন নেটওয়ার্ক, স্ট্রিমিং পরিষেবা এবং বিপুল কনটেন্ট লাইব্রেরি একই করপোরেট কাঠামোর অধীনে এসেছে। হলিউডে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার সমীকরণেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

একই ছাতার নিচে দুই স্টুডিওর ঐতিহ্য
প্যারামাউন্ট ও ওয়ার্নার ব্রাদার্স, দুই প্রতিষ্ঠানই কয়েক দশক ধরে বিশ্ব চলচ্চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। একদিকে প্যারামাউন্টের জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি ‘মিশন: ইমপসিবল’, ‘ট্রান্সফরমারস’, ‘টপ গান’ ও ‘স্টার ট্রেক’। অন্যদিকে ওয়ার্নার ব্রাদার্সের হাতে রয়েছে ‘হ্যারি পটার’, ‘ব্যাটম্যান’, ‘সুপারম্যান’ ও ‘ম্যাড ম্যাক্স’-এর মতো পরিচিত চলচ্চিত্র সিরিজ।
এই সংযুক্তির ফলে দুই প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক শক্তি ও মেধাস্বত্বের বিশাল ভান্ডার একই ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হবে। তবে দুই স্টুডিওর সব সৃজনশীল কার্যক্রম এক করে ফেলা হবে কি না, সে বিষয়ে ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
স্ট্রিমিংয়ে আসছে বড় পরিবর্তন
এই চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্ট্রিমিং ব্যবসা। প্যারামাউন্ট প্লাস ও এইচবিও ম্যাক্সের মতো পরিষেবা এখন একই প্রতিষ্ঠানের অধীনে এসেছে। ফলে ভবিষ্যতে দর্শকদের জন্য একীভূত স্ট্রিমিং পরিষেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে নতুন পরিষেবার চূড়ান্ত নাম, কাঠামো ও কার্যকর হওয়ার সময় নিয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অপেক্ষায়।
এ ছাড়া সিবিএস, সিএনএন, এইচবিওসহ দুই প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন টেলিভিশন ও সংবাদমাধ্যমও নতুন করপোরেট কাঠামোর অংশ হয়েছে। এর ফলে বিনোদনের পাশাপাশি সংবাদ, টেলিভিশন অনুষ্ঠান ও ক্রীড়া সম্প্রচারের ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটির প্রভাব বাড়বে।
ডিজনি-নেটফ্লিক্সের প্রতিযোগিতায় নতুন সমীকরণ
বিশ্বব্যাপী স্ট্রিমিং ও চলচ্চিত্র ব্যবসায় প্রতিযোগিতা দিন দিন তীব্র হচ্ছে। ডিজনি, নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন ও অ্যাপলের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বড় কনটেন্ট লাইব্রেরি ও বৈশ্বিক বাজারে উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

প্যারামাউন্ট ও ওয়ার্নার ব্রাদার্সের সম্পদ একত্র হওয়ায় স্কাইড্যান্স সেই প্রতিযোগিতায় শক্তিশালী অবস্থান তৈরির সুযোগ পাবে। প্রতিষ্ঠানটি বছরে অন্তত ৩০টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির উপযোগী চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং ১৮০টির বেশি টেলিভিশন অনুষ্ঠান ও সিরিজ সরবরাহের লক্ষ্য জানিয়েছে। একই সঙ্গে তিন বছরের মধ্যে বছরে অন্তত ৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় সাশ্রয়ের পরিকল্পনাও রয়েছে।
সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়
বিশাল এই অধিগ্রহণের পর নতুন প্রতিষ্ঠানের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দুই প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কাঠামো সমন্বয় করা, বিপুল ঋণের চাপ সামলানো এবং সৃজনশীল স্বাধীনতা বজায় রাখা। ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় কর্মসংস্থান ও চলচ্চিত্র নির্মাণের ওপর কী প্রভাব পড়ে, সেটিও নজরে থাকবে।

এ ছাড়া এত বড় কনটেন্ট ভান্ডার একই প্রতিষ্ঠানের অধীনে চলে আসায় বাজারে প্রতিযোগিতা ও দর্শকদের পছন্দের বৈচিত্র্য নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। স্কাইড্যান্সের পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হয়, তা নির্ভর করবে নতুন সিনেমা, টেলিভিশন অনুষ্ঠান ও স্ট্রিমিং পরিষেবার মান এবং দর্শকের সাড়া পাওয়ার ওপর।
সব মিলিয়ে, প্যারামাউন্ট ও ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারির এই ঐতিহাসিক সংযুক্তি শুধু হলিউডের মালিকানা কাঠামোয় পরিবর্তন নয়, বিশ্ব বিনোদন ব্যবসার ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।












