১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট, বাংলা ১৩৮৩ সালের ১২ ভাদ্র ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদসংলগ্ন স্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয় তাঁকে। বাংলা সাহিত্যে মাত্র ২৩ বছরের সৃষ্টিশীল জীবনে কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটকসহ নানা মাধ্যমে তিনি যে অনন্য সৃষ্টিসম্ভার রেখে গেছেন, তা আজও বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এবারের মৃত্যুবার্ষিকী ঘিরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আয়োজন করেছে আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সংগীত পরিবেশনা, দোয়া ও স্মরণসভা। কবির সাহিত্য ও দর্শনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কাছে নজরুলের সৃষ্টিকে আরও গভীরভাবে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগও রয়েছে।

টেলিভিশনে নজরুল স্মরণ
জাতীয় কবির মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে চ্যানেল আই সাজিয়েছে দিনব্যাপী বিশেষ আয়োজন। সকালে ‘গান দিয়ে শুরু’র বিশেষ পর্বে পরিবেশিত হয়েছে নজরুলের জনপ্রিয় গান। দুপুরে রয়েছে নজরুলের চলচ্চিত্রের গান নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠান।

বিকেলে প্রচারিত হবে কবির জীবনভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘বাংলা মায়ের দামাল ছেলে’। আর সন্ধ্যায় বিশেষ সংগীতানুষ্ঠান ‘নীরব কেন কবি’-তে নজরুলগীতি পরিবেশন করবেন কিংবদন্তি শিল্পী ফেরদৌস আরা। রাতে ‘নজরুল ও প্রকৃতি’ অনুষ্ঠানে নজরুলের সৃষ্টিতে প্রকৃতি, মানুষ ও মানবিকতার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা ও পরিবেশনা থাকবে।
এনটিভিতেও রয়েছে বিশেষ আয়োজন। নজরুলের গান অবলম্বনে নির্মিত নাটক ‘গভীর নিশীথে’ প্রচারের পাশাপাশি সন্ধ্যায় থাকছে সংগীতানুষ্ঠান ‘অন্তরে তুমি আছো চিরদিন’। এতে নজরুলের বিভিন্ন ধর্মীয় সংগীত পরিবেশন করবেন খায়রুল আনাম শাকিল, ইয়াকুব আলী খান, লীনা তাপসী খান, ইয়াসমীন মুশতারী, ফেরদৌস আরা ও এম এ মান্নান। রাতে থাকছে ‘মিউজিক নাইট’।
শিশুদের জন্যও নজরুলকে ঘিরে আয়োজন করেছে দুরন্ত টিভি। ‘গানের পাখি বুলবুল’ অনুষ্ঠানে শিশুশিল্পীদের কণ্ঠে শোনা যাবে নজরুলের জনপ্রিয় গান। পাশাপাশি ‘সকাল বেলার পাখি’ অনুষ্ঠানে শিশুদের নাট্যরূপে উপস্থাপন করা হবে কবির বিভিন্ন কবিতা। এর মধ্য দিয়ে ছোটদের কাছে নজরুলের সাহিত্য ও ভাবনাকে সহজভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
শিল্পকলা একাডেমিতে দুই দিনের আয়োজন
জাতীয় কবির ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজন করেছে দুই দিনব্যাপী আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আজ সন্ধ্যায় জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে এবং আগামীকাল জাতীয় সংগীত ও নৃত্যকলা কেন্দ্র মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে এসব আয়োজন। অনুষ্ঠানে নজরুলের জীবন, সাহিত্য, দর্শন ও সৃষ্টিকর্ম নিয়ে আলোচনা ছাড়াও থাকবে গান ও নৃত্য পরিবেশনা।

এর আগে চলতি বছরও নজরুলের সাহিত্য, সংগীত ও মানবিক দর্শনকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে ‘বর্ষায় নজরুল’সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজন করেছে শিল্পকলা একাডেমি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন
নজরুলের সমাধিকে ঘিরেও রয়েছে বিশেষ কর্মসূচি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা শোভাযাত্রা করে কবির সমাধিতে গিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। পরে সমাধি প্রাঙ্গণের উন্মুক্ত মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে আলোচনা সভা। এতে স্মারক বক্তৃতা করবেন নজরুল গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক ড. তারিক মনজুর।
নজরুল ইনস্টিটিউটে ‘মৃত্যুঞ্জয়ী নজরুল’
কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে আয়োজন করা হয়েছে ‘মৃত্যুঞ্জয়ী নজরুল’ শীর্ষক বিশেষ অনুষ্ঠান। এতে রয়েছে আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল ও হামদ-নাত। অনুষ্ঠানে সংস্কৃতি সচিব কানিজ মাওলা প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন কবির পৌত্রী ও ইনস্টিটিউট ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান খিলখিল কাজী।

এদিকে নজরুল একাডেমিও নিয়েছে তিন দিনব্যাপী কর্মসূচি। কবির সমাধিতে ফাতেহা পাঠ ও ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি রয়েছে মিলাদ মাহফিল, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
৫০ বছর পরও প্রাসঙ্গিক নজরুল
নজরুলের প্রয়াণের পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও তাঁর সৃষ্টির আবেদন এতটুকু ম্লান হয়নি। শোষণ-বঞ্চনা, অন্যায়-অবিচার ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তাঁর উচ্চারণ আজও সমান শক্তিশালী। একই সঙ্গে প্রেম, সাম্য ও মানবতার যে দর্শন তিনি রেখে গেছেন, তা বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তাঁকে করে রেখেছে চিরকালীন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব।
১৯৭২ সালের ২৪ মে স্বাধীন বাংলাদেশে সপরিবারে আসেন কাজী নজরুল ইসলাম। এরপর তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয়। তাঁর প্রতি রাষ্ট্রীয় ও মানুষের এই শ্রদ্ধা আজও অব্যাহত।
তাই মৃত্যুবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিকতার বাইরেও নজরুলকে স্মরণ করার মূল জায়গাটি তাঁর সৃষ্টি ও দর্শনেই। পাঁচ দশক পরও তাঁর কবিতা-গান যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠে, তখন আরও স্পষ্ট হয় নজরুলের মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু তাঁর চেতনার মৃত্যু হয়নি।












