একসময় ওজন দাঁড়িয়েছিল প্রায় ২৩০ কেজি। শরীরের অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে চিকিৎসকের কাছ থেকে শুনতে হয়েছিল ভয়ংকর সতর্কবার্তা—জীবনযাত্রায় পরিবর্তন না আনলে হয়তো আর মাত্র ছয় মাস বাঁচবেন। সেই কথা শুনেও প্রথমে খুব একটা গুরুত্ব দেননি বলিউডের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ও সুরকার আদনান সামি। কিন্তু বাবার চোখের পানি এবং একটি আবেগঘন কথোপকথন শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবন বদলে দেয়।

আজকের আদনান সামিকে দেখলে সেই সময়ের সঙ্গে তাঁকে মেলানো কঠিন। একসময় প্রায় ২৩০ কেজি ওজনের এই শিল্পী দীর্ঘ সময়ের কঠোর পরিশ্রমে কমিয়েছেন প্রায় ১২০ কেজি ওজন। আর এই বিশাল পরিবর্তনের পেছনে কোনো জাদুকরী পদ্ধতি কিংবা ওজন কমানোর অস্ত্রোপচার নয়—ছিল খাদ্যাভ্যাসের কঠোর নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং জীবনযাপনে বড় ধরনের পরিবর্তন।
ছয় মাসের সেই ভয়ংকর সতর্কবার্তা
আদনান সামির জীবনের এই ঘটনা বহু বছর আগের। ২০০৬ সালে তাঁর ওজন যখন প্রায় ২৩০ কেজি, তখন চিকিৎসকেরা তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। চিকিৎসকের দেওয়া সেই সতর্কবার্তা ছিল রীতিমতো জীবন-মৃত্যুর বার্তা—এই জীবনযাপন চালিয়ে গেলে ছয় মাসের মধ্যে তাঁর মৃত্যু ঘটতে পারে।
সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছিল ঘটনাটি বাবার সামনে ঘটায়। পরবর্তী সময়ে নিজের ওজন কমানোর গল্প বলতে গিয়ে আদনান জানিয়েছেন, বাবার আবেগ তাঁকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। সেই মুহূর্তেই নিজের জীবন বদলে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
মজার বিষয় হলো, সতর্কবার্তা শোনার পরপরই কিন্তু তিনি নিজেকে বদলে ফেলেননি। বরং একবার খাবারের প্রতি নিজের দুর্বলতার কাছেই যেন ফিরে গিয়েছিলেন। কিন্তু বাবার সঙ্গে সেই আবেগঘন কথোপকথনের পর সিদ্ধান্ত নেন—এভাবে আর চলবে না।
২৩০ কেজি থেকে ১১০ কেজির কাছাকাছি
এরপর শুরু হয় কঠিন পরিবর্তনের সময়। আদনান সামি জানিয়েছেন, তিনি কোনো ব্যারিয়াট্রিক সার্জারি কিংবা লাইপোসাকশন করাননি। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনের একজন পুষ্টিবিদের সহায়তায় কঠোর উচ্চ-প্রোটিন খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করেন এবং নিজের জীবনযাত্রাকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলেন।

এক পর্যায়ে প্রায় ১২০ কেজি ওজন কমাতে সক্ষম হন তিনি। ২০২৫ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের এই রূপান্তর নিয়ে কথা বলার সময় আদনান পরিষ্কার করে দেন, তাঁর এই পরিবর্তনের পেছনে অস্ত্রোপচারের কোনো ভূমিকা ছিল না। বরং দীর্ঘ সময় ধরে খাদ্য নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপনই ছিল তাঁর প্রধান অস্ত্র।
তাঁর খাদ্যাভ্যাসেও এসেছিল বড় পরিবর্তন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তিনি রুটি, ভাত, চিনি ও তেলসহ বেশ কিছু খাবার বাদ দিয়ে উচ্চ-প্রোটিননির্ভর খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করেছিলেন। প্রথম দিকেই দ্রুত ওজন কমতে শুরু করেছিল তাঁর। তবে পুরো পরিবর্তনটি ছিল দীর্ঘমেয়াদি এবং কঠোর নিয়মানুবর্তিতার ফল।
অস্ত্রোপচারের গুঞ্জন কেন?
আদনান সামির অবিশ্বাস্য শারীরিক পরিবর্তন দেখে বহু বছর ধরেই নানা ধরনের আলোচনা হয়েছে। এত বিপুল ওজন কীভাবে কমালেন—এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা জল্পনা ছড়িয়েছে। কেউ বলেছেন অস্ত্রোপচার, কেউ আবার লাইপোসাকশনের কথা বলেছেন।
কিন্তু আদনান নিজেই এসব দাবি নাকচ করেছেন। ২০২৫ সালের ‘আপ কি আদালত’ অনুষ্ঠানে তিনি স্পষ্টভাবে জানান, ওজন কমানোর জন্য তিনি ব্যারিয়াট্রিক সার্জারি বা লাইপোসাকশন—কোনোটিই করাননি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পুষ্টিবিদের পরামর্শ, কঠোর খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাপনের পরিবর্তনের মাধ্যমেই এই রূপান্তর সম্ভব হয়েছে।

তাহলে এখন কেমন আছেন আদনান সামি?
এটাই হয়তো তাঁর ভক্তদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, আদনান সামি এখনো সংগীতের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। ২০২৬ সালের আগস্টে তাঁর নতুন রোমান্টিক গান ‘ইশক তামাশা’ প্রকাশের খবরও এসেছে। নতুন এই গানে নিজের পরিচিত রোমান্টিক ঘরানার বাইরে কিছুটা ভিন্ন আবহে কাজ করেছেন তিনি।
অর্থাৎ, সেই ছয় মাসের ভয়ংকর ভবিষ্যদ্বাণী পেরিয়ে বহু বছর পরও আদনান সামি সংগীতের জগতে সক্রিয়। শুধু শারীরিক রূপান্তর নয়, সৃষ্টিশীলতার দিক থেকেও তিনি নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপন করছেন।
তবে তাঁর বর্তমান নির্দিষ্ট ওজন বা শারীরিক অবস্থার বিষয়ে সাম্প্রতিক নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই এখন তাঁর ওজন কত—এমন কোনো সংখ্যা নিশ্চিতভাবে বলা ঠিক হবে না। এটুকু অবশ্য নিশ্চিত, ২০০৬ সালের সেই সংকটময় সময়ের পর তিনি নিজের জীবনযাত্রায় যে পরিবর্তন এনেছিলেন, সেটিই তাঁর জীবনের অন্যতম বড় মোড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাবার সেই কথাই বদলে দিয়েছিল জীবন
আদনান সামির গল্প তাই শুধু ওজন কমানোর গল্প নয়। এটি নিজের জীবনকে দ্বিতীয়বার সুযোগ দেওয়ার গল্প। চিকিৎসকের কাছ থেকে মাত্র ছয় মাসের সতর্কবার্তা শোনার পরও তিনি হাল ছাড়েননি। বরং বাবার আবেগ, নিজের পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং বেঁচে থাকার তীব্র ইচ্ছাকে শক্তিতে পরিণত করেছিলেন।
একসময় ২৩০ কেজি ওজনের কারণে জীবন নিয়ে শঙ্কায় থাকা সেই মানুষটিই পরবর্তী সময়ে প্রায় ১২০ কেজি ওজন কমিয়ে দেখিয়েছেন—পরিবর্তন সম্ভব, যদি সিদ্ধান্তটা সত্যিই দৃঢ় হয়।

আর সেই কারণেই আদনান সামির ওজন কমানোর গল্প আজও বারবার ফিরে আসে। কারণ এটি কোনো রাতারাতি বদলে যাওয়ার গল্প নয়; বরং ভয়, হতাশা আর অসহায়তার জায়গা থেকে উঠে এসে নিজের জীবনকে নতুন করে সাজানোর গল্প।











