১০ কারিগরের ৯০ দিনের পরিশ্রম, ইশার লেহেঙ্গায় ফুটল ঐতিহ্য

FashionLIFESTYLE

ফ্যাশনে আভিজাত্য মানেই শুধু দামি পোশাক কিংবা ভারী গয়না নয়, কখনো কখনো একটি পোশাক হয়ে উঠতে পারে শিল্প, ঐতিহ্য ও কারুশিল্পের গল্প বলার মাধ্যম। ভারতীয় ধনকুবের মুকেশ আম্বানির মেয়ে ইশা আম্বানির সাম্প্রতিক সাজে দেখা গেল তেমনই এক ব্যতিক্রমী আয়োজন। ক্রিম রঙের সিল্কের জমিনে রাধাকৃষ্ণের রাসলীলা, ঐতিহ্যবাহী চিত্রশৈলী আর নিখুঁত কারুকাজে তৈরি তাঁর লেহেঙ্গা যেন একখণ্ড চলমান শিল্পকর্ম।

প্রখ্যাত ডিজাইনার করণ তোরানি ও ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী শিল্প ও কারুশিল্পকে সামনে তুলে ধরার উদ্যোগ স্বদেশের যৌথ প্রয়াসে তৈরি হয়েছে এই বিশেষ পোশাক। কলমকারি ও ওড়িশার পট্টচিত্র শিল্পরীতির সংমিশ্রণে লেহেঙ্গাটিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে পৌরাণিক দৃশ্য, প্রকৃতির নানা অনুষঙ্গ এবং ঐতিহ্যবাহী নকশা।

২০০০ ঘণ্টার পরিশ্রমে তৈরি লেহেঙ্গা

ইশার এই পোশাকের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক এর নির্মাণশৈলী। ডিজাইনারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১০ জন দক্ষ কারিগর ৯০ দিনেরও বেশি সময় ধরে লেহেঙ্গাটি তৈরিতে কাজ করেছেন। সব মিলিয়ে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২০০০ কর্মঘণ্টা।

খাঁটি সিল্কের ক্রিম রঙের জমিনে হাতে আঁকা হয়েছে রাধা-কৃষ্ণের রাসলীলার দৃশ্য। নীল, লাল ও সোনালি রঙের ব্যবহার পোশাকটিতে এনেছে গভীরতা ও রাজকীয় আভা। প্রতিটি প্যানেলের নকশায় রয়েছে সূক্ষ্মতার ছাপ। কোথাও পৌরাণিক কাহিনির দৃশ্য, কোথাও পদ্মফুল, ময়ূর কিংবা স্থাপত্যের মোটিফ।

কলমকারির সূক্ষ্ম রেখা এবং পট্টচিত্রের অলংকরণধর্মী বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে মিশে পোশাকটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়। এখানে নকশা কেবল সাজসজ্জার অংশ নয়, বরং ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী শিল্পের একটি দৃশ্যমান উপস্থাপন।

গয়নাতেও রাজকীয় ছোঁয়া

এত কারুকাজসমৃদ্ধ লেহেঙ্গার সঙ্গে গয়না নির্বাচনের ক্ষেত্রেও ভারসাম্য রেখেছেন ইশা। তাঁর কানে ছিল ময়ূরের মোটিফ ও কুন্দনের কাজ করা জমকালো ঝুমকা। নিচে ঝুলন্ত মুক্তা ও ঝালরের নকশা গয়নাটিতে যোগ করেছে ঐতিহ্যবাহী আভিজাত্য।

 

গলায় পরেছিলেন সোনা ও কুন্দনের কাজ করা চোকার নেকলেস। রঙিন পাথর ও ছোট মুক্তোর ঝালর গয়নাটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। হাতে চওড়া জড়োয়া বালা এবং আঙুলে বড় আকারের ঐতিহ্যবাহী আংটি পুরো সাজে এনেছে রাজকীয় আবহ।

পোশাকের নকশা ও গয়নার জৌলুসের মধ্যে এমন সমন্বয় উৎসবের সাজে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পোশাকের নিজস্ব কারুকাজকে আড়াল না করে গয়না যখন তার সৌন্দর্যকে আরও ফুটিয়ে তোলে, তখন পুরো সাজ হয়ে ওঠে পরিপূর্ণ।

চুলের সাজে রঙিন অনুষঙ্গ

ইশার চুলের সাজেও ছিল আলাদা পরিকল্পনা। সামনের দিকে হালকা পাফ তৈরি করে চুলের পেছনের অংশ হাফ-আপ স্টাইলে বাঁধা হয়েছিল। বাকি চুলে রাখা হয়েছিল নরম কার্ল, যা পিঠের ওপর নেমে এসে সাজে কোমলতা যোগ করেছে।

তবে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে চুলের পেছনে যুক্ত ঐতিহ্যবাহী লটকান। টোনোটো ব্র্যান্ডের এই হেয়ার অ্যাক্সেসরিতে ছিল রঙিন পমপম, সুতার ঝালর, ছোট কড়ি ও কাপড়ের নকশা। প্রচলিত হেয়ারপিন বা সাধারণ অলংকারের বদলে এমন রঙিন অনুষঙ্গ সাজটিকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা।

এই ধরনের হেয়ার অ্যাক্সেসরি ঐতিহ্যবাহী পোশাকের সঙ্গে আধুনিক স্টাইলের সংযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে উৎসব, বিয়েবাড়ি কিংবা সাংস্কৃতিক আয়োজনে পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে চুলের সাজে এমন একটি বিশেষ অনুষঙ্গ যোগ করলে পুরো লুকেই আসে নতুনত্ব।

মেকআপে উজ্জ্বলতা ও নাটকীয়তা

ইশার মেকআপে ছিল উজ্জ্বল ত্বকের আভা, হালকা ব্লাশ ও সফট কন্টোরিং। চোখে ড্রামাটিক উইংড আইলাইনার, স্মোকি ইফেক্ট এবং বেগুনি বা নীলচে ঝিলমিল আইশ্যাডার ব্যবহার সাজে এনেছে নাটকীয়তা। ঠোঁটে ছিল ন্যুড কিংবা মভ রঙের ম্যাট লিপস্টিক।

অন্যদিকে, নখের সাজে বেছে নেওয়া হয়েছিল ক্লাসিক ফ্রেঞ্চ ম্যানিকিউর। ভারী গয়না, রঙিন চুলের অনুষঙ্গ ও চোখের জমকালো সাজের বিপরীতে নখের এই সরলতা পুরো লুকটিকে দিয়েছে ভারসাম্য।

ঐতিহ্য যখন আধুনিক ফ্যাশনের অনুপ্রেরণা

ইশা আম্বানির এই সাজের বিশেষত্ব শুধু এর জাঁকজমকে নয়, বরং ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে আধুনিক ফ্যাশনের অংশ করে তোলার প্রচেষ্টায়। হাতে আঁকা পৌরাণিক দৃশ্য, প্রাচীন চিত্রশৈলী, দক্ষ কারিগরের দীর্ঘ পরিশ্রম এবং আধুনিক স্টাইলিং একসঙ্গে মিলে পোশাকটিকে করেছে ব্যতিক্রমী।

এ ধরনের পোশাক মনে করিয়ে দেয়, ঐতিহ্যকে ফ্যাশনে তুলে ধরতে সব সময় নতুন নকশা আবিষ্কারের প্রয়োজন হয় না। বরং পুরোনো শিল্পরীতিকে যত্নের সঙ্গে সংরক্ষণ করে সমকালীন রুচির সঙ্গে মিলিয়ে দিলেও তৈরি হতে পারে অনন্য সৃষ্টি।

প্রায় ২০০০ ঘণ্টার কারুশিল্প, রাধাকৃষ্ণের রাসলীলা এবং গয়না থেকে চুলের সাজ পর্যন্ত প্রতিটি খুঁটিনাটিতে ইশা আম্বানির এই লুক তাই হয়ে উঠেছে ঐতিহ্যনির্ভর রাজকীয় ফ্যাশনের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

You may also like

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *