একসময় টেলিভিশন নাটকের ব্যস্ততম অভিনেতাদের একজন ছিলেন জাহিদ হাসান। গল্প, চরিত্র আর অভিনয়ের বৈচিত্র্যে নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করেছেন দীর্ঘ ক্যারিয়ারে। অথচ সময়ের সঙ্গে তার কাজের সংখ্যা কমেছে। পর্দায় নিয়মিত দেখা না গেলেও অভিনয় থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি তিনি। বরং এখন তার বেছে নেওয়ার জায়গাটা আরও স্পষ্ট গল্প ভালো হতে হবে, চরিত্রে থাকতে হবে অভিনয়ের সুযোগ।

সম্প্রতি চার বছর পর নাটকে ফিরেছেন জাহিদ হাসান। এর আগে সিনেমায়ও বিরতি ভেঙে ফিরেছিলেন। নতুন কাজ নিয়ে আলোচনায় এলেও নিয়মিত অভিনয় না করার কারণ হিসেবে তিনি বলছেন, ভালো চিত্রনাট্যই পাচ্ছেন না। তার কাছে কাজের সংখ্যার চেয়ে কাজটির মান গুরুত্বপূর্ণ।
কাজ কমেছে, কিন্তু অভিনয়ের ইচ্ছা কমেনি
জাহিদ হাসানের কথায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তিনি অভিনয় থেকে দূরে থাকতে চান না। বরং নিয়মিত কাজ করার ইচ্ছাই তার আছে। কিন্তু গতানুগতিক গল্প কিংবা চরিত্রে নিজেকে বারবার দেখতে চান না।
গত দুই বছরে নাটক ও সিনেমা মিলিয়ে তার কাছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক চিত্রনাট্যও আসেনি। কয়েকটি সিনেমার প্রস্তাব এলেও সেগুলোর কোনোটিই শেষ পর্যন্ত এগোয়নি। ফলে পর্দায় তার উপস্থিতি কমে যাওয়ার পেছনে অনীহা নয়, বরং পছন্দের কাজের সংকটই বড় কারণ।

এ জায়গাতেই জাহিদ হাসানের অবস্থানটা বর্তমান সময়ের অনেক অভিনয়শিল্পীর চেয়ে আলাদা। তিনি যেন কাজের ব্যস্ততার চেয়ে কাজের প্রয়োজনীয়তাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
নাটকের বদলে গেছে সেই সময়
জাহিদ হাসানের আক্ষেপটা শুধু নিজের কাজ না পাওয়া নিয়ে নয়। তার কথায় উঠে এসেছে পুরো নাট্যাঙ্গনের পরিবর্তনের ছবিও।
তার মতে, আগের মতো ভালো কাজের সংখ্যা কমে গেছে। একসময় যেসব সহশিল্পীর সঙ্গে নিয়মিত কাজ করতেন, তাদের অনেকেই এখন নাটক থেকে দূরে। ফলে নাটকের পরিবেশও আগের মতো নেই।
তবে এই পরিবর্তনের জন্য শুধু নির্মাতা কিংবা শিল্পীদের দায়ী করছেন না তিনি। বর্তমান সময়ের দর্শকপ্রিয়তার অন্যতম মাপকাঠি হয়ে ওঠা ভিউয়ের চাপের কথাও বলেছেন জাহিদ।

তার পর্যবেক্ষণ, তরুণ অভিনয়শিল্পীদের অনেকে চাইলেও সব ধরনের কাজ এড়িয়ে যেতে পারেন না। ভিউয়ের কারণে নানা ধরনের কাজ করতে হয় তাদের। এখানেই একজন শিল্পীর জন্য নিজের অবস্থান তৈরি করার বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
‘সবকিছু খেতে গেলে হবে না’
তরুণদের জন্য জাহিদ হাসানের পরামর্শ বেশ সরাসরি সব কাজ করা যাবে না।
কোন কাজটি করবেন আর কোনটি করবেন না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা একজন শিল্পীর থাকা দরকার। কারণ, শুধু নিয়মিত পর্দায় থাকার জন্য কাজ করলে একসময় নিজের স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে যেতে পারে।

তবে নতুনদের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক নয়। বরং খায়রুল বাসারের অভিনয়ে সম্ভাবনা দেখেছেন তিনি। ‘পথহারা মন’ নাটকে বাসারের অভিনয় তার নজর কেড়েছে। জাহিদের মতে, বাসারের মধ্যে সম্ভাবনা রয়েছে, তবে আরও ভালো করতে হলে প্রয়োজন বেশি ডেডিকেশন ও স্থিরতা।
এই মন্তব্যের তাৎপর্যও আছে। কারণ ‘পথহারা মন’-এ জাহিদ হাসানের সঙ্গে অভিনয় করেছেন খায়রুল বাসার ও তানজিম সাইয়ারা তটিনী। নাটকটির মাধ্যমে নির্মাতা মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজের সঙ্গেও প্রায় আট বছর পর আবার কাজ করেছেন জাহিদ।
মোশাররফকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবছেন না
বর্তমান নাটকের আলোচিত অভিনয়শিল্পীদের প্রসঙ্গ এলে স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে মোশাররফ করিমের নাম। তবে জাহিদ হাসানের কাছে বিষয়টি কোনো প্রতিযোগিতার নয়।
চরকির কার্নিভ্যালে মোশাররফ করিমের অভিনয়ের প্রশংসা করার কারণও পরিষ্কার করেছেন তিনি। তার বক্তব্যের সারকথা একজন সহশিল্পী ভালো অভিনয় করলে সেটাকে ভালো বলার মধ্যে প্রতিযোগিতার কিছু নেই।

বরং ভালো কাজের প্রশংসা না করাটাকেই এক ধরনের অন্যায় মনে করেন জাহিদ। একজন শিল্পীকে প্রকাশ্যে প্রশংসা করার মধ্য দিয়ে তাকে উৎসাহ দেওয়া যায়, তার কাজের গতি বাড়ানো যায়। সমালোচনার পাশাপাশি এই ইতিবাচক ফিডব্যাকও অভিনয়শিল্পীর জন্য জরুরি।
এখানে জাহিদ হাসানের কথায় তার দীর্ঘ অভিনয়জীবনের একটা দর্শনও স্পষ্ট হয় অন্যের সাফল্য নিজের ব্যর্থতা নয়।
বদনাম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর নীরব থাকা
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে প্রশংসার পাশাপাশি সমালোচনাও পেয়েছেন জাহিদ হাসান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর অভিজ্ঞতাও হয়েছে।
তার অভিযোগ, কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে নিয়ে কিছু লিখলে অনেকে যাচাই না করেই তা শেয়ার করেন। এভাবেই অসত্য তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। এসব বিষয় কখনো কখনো তাকে মন খারাপও করায়।
তবে প্রতিটি কথার জবাব দেওয়ার পথে হাঁটতে চান না তিনি। বরং নিজের কাজ, পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যেই থাকতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন।
এখন নিজের জন্যও সময় রাখছেন
আগের মতো সব আয়োজন কিংবা অনুষ্ঠানে দেখা যায় না জাহিদ হাসানকে। এর পেছনে তার নিজের সিদ্ধান্তও রয়েছে। অনেক জায়গায় ইচ্ছা করেই যান না। বাসায় থাকেন, নিজের ব্যবসা দেখেন, পরিবার ও বন্ধুদের সময় দেন।
অভিনয়ের বাইরে নিজের জন্য সময় রাখার প্রয়োজনীয়তাও এখন অনুভব করছেন তিনি। শরীরচর্চা বা হাঁটার অভ্যাস আগের তুলনায় কমে গেলেও নিজেকে আরও সময় দেওয়া উচিত এ উপলব্ধি তার আছে।

সব মিলিয়ে জাহিদ হাসানের বর্তমান সময়টা যেন কম কাজের নয়, বেছে কাজ করার সময়। দীর্ঘ ক্যারিয়ারের অভিজ্ঞতা তাকে হয়তো শিখিয়েছে পর্দায় নিয়মিত থাকার চেয়ে মনে রাখার মতো কাজ করে যাওয়াই বেশি জরুরি। তাই চার বছর পর নাটকে ফিরে প্রশংসা পাওয়ার পরও তার তাড়াহুড়ো নেই। তিনি অপেক্ষা করছেন সেই গল্পটির জন্য, যে গল্পে আবারও নিজের অভিনয়ের নতুন কোনো দিক দেখাতে পারবেন।












