সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে জীবন ও মৃত্যুর অনিবার্যতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে লাকি আলী জানিয়েছেন, তিনি মৃত্যুর জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত। শুধু তা-ই নয়, ভ্রমণের সময় নিজের সঙ্গে ইহরামও রাখেন তিনি। তাঁর কাছে সেটিই প্রয়োজনে কাফনের কাপড় হিসেবে ব্যবহারযোগ্য।
মৃত্যু নিয়ে লাকি আলীর এমন স্বচ্ছন্দ স্বীকারোক্তি অনেকের কাছেই চমকপ্রদ। কিন্তু তাঁর কথার ভেতরে আতঙ্কের চেয়ে বরং জীবনের অনিবার্য সত্যকে মেনে নেওয়ার এক ধরনের আধ্যাত্মিকতা রয়েছে।

‘একদিন তো সবাইকে চলে যেতে হবে’
অনুষ্ঠানে দর্শকদের উদ্দেশে লাকি আলী বলেন, তিনি কাউকে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত করছেন না; বরং নিজেই সেই যাত্রার জন্য প্রস্তুত। তাঁর কথায়, একদিন সবাইকে পৃথিবী ছেড়ে যেতে হবে এটাই বাস্তবতা।
নিজের প্রস্তুতির প্রসঙ্গেই ইহরামের কথা জানান তিনি। ভ্রমণের সময় ইহরাম সঙ্গে রাখেন লাকি। যদি কোথাও তাঁর মৃত্যু হয়, সেখান থেকেই যেন তাঁকে শেষযাত্রায় পাঠানো যায় এমন একটি মানসিক প্রস্তুতি থেকেই এই অভ্যাস।
এই বক্তব্যের পর উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে আবেগ তৈরি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে তাঁর বক্তব্যের ভিডিও। প্রিয় শিল্পীর মুখে মৃত্যুর কথা শুনে অনেক ভক্তই তাঁকে দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন কামনা করেছেন।

যে কণ্ঠে আটকে আছে কয়েক প্রজন্ম
লাকি আলীর জনপ্রিয়তা কেবল তাঁর গান গাওয়ার ধরনে নয়; তাঁর কণ্ঠে থাকা এক ধরনের নির্লিপ্ত আবেগই তাঁকে আলাদা করে। নব্বইয়ের দশকে স্বাধীন সংগীতের উত্থানের সময় ‘সুনোহ’ অ্যালবামের মাধ্যমে তাঁর নতুন পরিচয় তৈরি হয়। ‘ও সনম’ হয়ে ওঠে সেই সময়ের অন্যতম স্মরণীয় গান।
এরপর ‘গোরি তেরি আঁখেঁ কহেঁ’, ‘তেরি ইয়াদ জব আতি হ্যায়’ কিংবা সিনেমার ‘না তুম জানো না হাম’, ‘এক পল কা জিনা’, ‘জানে ক্যায়া ঢুঁঢতা হ্যায়’—একটির পর একটি গান তাঁকে পৌঁছে দেয় আরও বড় শ্রোতাগোষ্ঠীর কাছে। তিন দশকের সংগীতজীবন পেরিয়েও তাঁর গানে পুরোনো শ্রোতারা খুঁজে পান নিজেদের ফেলে আসা সময়।
২০২৬ সালে সংগীতজীবনের তিন দশক পূর্ণ করেছেন লাকি আলী। সাম্প্রতিক সময়েও নতুন গান প্রকাশের মাধ্যমে নিজের স্বতন্ত্র সংগীতভাষা ধরে রেখেছেন তিনি। ‘তু জানে হ্যায় কাহাঁ’ গানটি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে শিল্পী জানিয়েছিলেন, সংগীত তাঁর কাছে কোনো দ্রুত তৈরি করা পণ্য নয়; বরং সময়, অনুভূতি ও যত্নের বিষয়।
অভিনয়ের পরিবার, নিজের পথ সংগীতে
লাকি আলীর জন্ম এমন একটি পরিবারে, যেখানে অভিনয় ছিল পরিচিত জগৎ। তাঁর বাবা ছিলেন জনপ্রিয় অভিনেতা মেহমুদ। ফলে অভিনয়ের সুযোগ তাঁর সামনে ছিল সহজেই। নিজেও অভিনয়ে এসেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বুঝেছিলেন ক্যামেরার সামনে অভিনয়ের চেয়ে সংগীতেই তাঁর নিজস্ব প্রকাশ বেশি স্বাভাবিক।

২০২৬ সালের এক সাক্ষাৎকারে লাকি আলী জানিয়েছিলেন, অভিনয় মূলত তাঁর বাবার ইচ্ছা ছিল। নিজের জন্য সংগীত ও গান গাওয়াকেই বেশি স্বাভাবিক মনে হয়েছে তাঁর।
এ কারণেই হয়তো মূলধারার চলচ্চিত্রের সাফল্যের চেয়েও নিজের সংগীতের স্বাতন্ত্র্যকে গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। খ্যাতি যখন তাঁকে ঘিরে ধরেছে, তখনও সেই খ্যাতির পেছনে ছুটে চলার মানুষ হয়ে ওঠেননি লাকি।
খ্যাতি নয়, নিজের মতো থাকা
লাকি আলীর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো জনপ্রিয়তার মধ্যেও তিনি নিজেকে মূলধারার প্রচারের বাইরে রাখতে পেরেছেন। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, খ্যাতি তাঁর কাছে এমন কিছু নয়, যা তিনি নিজের জন্য চেয়েছিলেন; বরং এটি তাঁর জীবনে এসে পড়েছে।
তাঁর সংগীতও সেই দর্শনের প্রতিফলন। বাজারের ট্রেন্ড কিংবা অ্যালগরিদমের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গান বানানোর চেয়ে নিজের অনুভূতি ও সময়কে গুরুত্ব দেন তিনি। এ কারণেই কয়েক দশক পরেও তাঁর গানকে পুরোনো মনে হয় না। শ্রোতার বাস্তবতা বদলেছে, সময় বদলেছে, কিন্তু গানের আবেগ রয়ে গেছে।
এআইয়ের যুগেও মানুষের কণ্ঠ
বর্তমান সংগীতজগতের আরেক বড় পরিবর্তন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। শিল্পীর কণ্ঠ নকল করে নতুন গান তৈরি থেকে শুরু করে সংগীতের বিভিন্ন পর্যায়ে এআইয়ের ব্যবহার এখন দ্রুত বাড়ছে। এই প্রবণতার ব্যাপারে লাকি আলী অবশ্য বেশ সতর্ক।
তিনি নিজেই জানিয়েছেন, সংগীত তৈরিতে এআই ব্যবহার করতে স্বচ্ছন্দ নন। তাঁর বিশ্বাস, সংগীতের প্রাণ তার মানবিক অনুভূতিতে। এমনকি নতুন একটি গানের ক্ষেত্রে এআই-নির্ভর দৃশ্য ব্যবহারের সম্ভাবনা থাকলেও সংগীত তৈরির জায়গায় তিনি মানুষ ও জীবন্ত বাদ্যযন্ত্রের ওপরই আস্থা রাখেন।
এখানেই যেন লাকি আলীর সঙ্গে তাঁর গানের সম্পর্কটা আরও পরিষ্কার হয়। প্রযুক্তি বদলাবে, শ্রোতার রুচি বদলাবে, সংগীতের মাধ্যম বদলাবে কিন্তু অনুভূতির জায়গাটি মানুষেরই।
মৃত্যুর কথা বলেও জীবনের গান
লাকি আলীর সাম্প্রতিক মৃত্যুচিন্তার কথাগুলো তাই শুধু বিষণ্নতার গল্প নয়। বরং তাঁর জীবনদর্শনের সঙ্গেও যেন মিলে যায়। যিনি খ্যাতির পেছনে ছুটেননি, নিজের মতো করে গান করেছেন, জনপ্রিয়তার চাপের চেয়ে নিজের শিল্পীসত্তাকে গুরুত্ব দিয়েছেন মৃত্যুকেও তিনি দেখছেন একই নির্লিপ্ত চোখে।

ভ্রমণের ব্যাগে ইহরাম রাখা হয়তো তাঁর কাছে শেষযাত্রার প্রস্তুতি। কিন্তু সেই প্রস্তুতির মাঝেও লাকি আলী এখনো গান করছেন, মঞ্চে উঠছেন, নতুন গান নিয়ে ফিরছেন। অর্থাৎ মৃত্যুকে মেনে নেওয়া আর জীবন থেকে সরে যাওয়া দুটিকে এক করে দেখেন না তিনি।
তাই ভক্তদের জন্য লাকি আলীর এই বক্তব্যের সবচেয়ে আবেগঘন দিকটি হয়তো তাঁর মৃত্যুচিন্তা নয়; বরং এই সত্য যে, তাঁর গান এখনো বেঁচে আছে মানুষের স্মৃতিতে।
‘ও সনম’ শুনে যে প্রজন্ম প্রেম চিনেছিল, ‘না তুম জানো না হাম’ শুনে যে প্রজন্ম কৈশোর পার করেছে, কিংবা আজকের শ্রোতা তাঁর নতুন গান শুনে যে অনুভূতি খুঁজে নেয় সব মিলিয়ে লাকি আলী আসলে একটি দীর্ঘ সংগীতস্মৃতির নাম।
আর হয়তো এ কারণেই তাঁর মুখে মৃত্যুর কথা শুনেও ভক্তরা শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কথা ভাবতে চান না। তাঁরা বরং চান এই স্বতন্ত্র কণ্ঠ আরও অনেক দিন গান গেয়ে যাক।












