বিমানবন্দরে ডন গ্রেপ্তার, ফের আলোচনায় সালমান শাহ হত্যা মামলা

DhallywoodUPDATE

প্রায় তিন দশক ধরে রহস্য আর বিতর্কে ঘেরা চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর মামলা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। মামলার অন্যতম আসামি চলচ্চিত্রের খল অভিনেতা মোহাম্মদ আশরাফুল হক ওরফে ডনকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করেছে ইমিগ্রেশন পুলিশ।

রোববার (৯ আগস্ট) বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তারের পর তাকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইমিগ্রেশন পুলিশ।

ডনের গ্রেপ্তারের খবর সামনে আসতেই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—৩২ বছর বয়সে নয়, মাত্র ২৫ বছর বয়সে থেমে যাওয়া সালমান শাহর মৃত্যুর সেই পুরোনো রহস্য কি এবার নতুন কোনো মোড় নিতে যাচ্ছে?

যে মৃত্যু আজও প্রশ্নবিদ্ধ

চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন, যিনি দর্শকের কাছে সালমান শাহ নামেই পরিচিত, ১৯৯০-এর দশকের শুরুতেই ঢালিউডে তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। অল্প সময়ের ক্যারিয়ারে একের পর এক সফল সিনেমা উপহার দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন তরুণ প্রজন্মের অন্যতম প্রিয় নায়ক।

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার ইস্কাটন রোডের বাসায় তার মরদেহ পাওয়া যায়। তখন তার বয়স মাত্র ২৫ বছর। তার মৃত্যু প্রথম থেকেই নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। পরিবারের পক্ষ থেকে বরাবরই দাবি করা হয়ে আসছে, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেননি; তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।

অন্যদিকে, দীর্ঘ সময়ের তদন্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা ভিন্ন সময়ে আত্মহত্যার দিকেই ইঙ্গিত করেছিল।

একাধিক তদন্তেও কাটেনি রহস্য

সালমান শাহর মৃত্যুর পর প্রথমে অপমৃত্যুর মামলা হয়। পরবর্তী সময়ে পরিবারের পক্ষ থেকে এটিকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে তদন্তের দাবি জানানো হয়।

১৯৯৭ সালে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত শেষে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিবেদন দেয়। পরে বিচার বিভাগীয় তদন্তেও হত্যার অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদন আসে।

তবে সালমান শাহর পরিবার সেইসব তদন্ত প্রতিবেদন মেনে নেয়নি। দীর্ঘদিন ধরে তারা দাবি করে আসছিল, নায়ককে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।

এরপর ২০১৬ সালে মামলাটি নতুন করে তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২০ সালে পিবিআই ৬০০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন আদালতে জমা দেয়। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, সালমান শাহকে হত্যা করা হয়নি; পারিবারিক টানাপোড়েনসহ বিভিন্ন কারণে তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন।

২০২১ সালের অক্টোবরে আদালত পিবিআইয়ের সেই প্রতিবেদন গ্রহণও করেন। তবে সালমান শাহর পরিবারের পক্ষ থেকে প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং হত্যার অভিযোগে বিচার চাওয়ার দাবি অব্যাহত থাকে।

২০২৫ সালে বদলে যায় মামলার গতিপথ

বহু বছর পর ২০২৫ সালের অক্টোবরে মামলাটিতে আসে বড় পরিবর্তন।

ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় করা অপমৃত্যুর মামলা বাতিল করে ঘটনাটিকে হত্যা মামলা হিসেবে তদন্তের নির্দেশ দেন। আদালতের ওই আদেশের পর ২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর রমনা থানায় সালমান শাহর পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যা মামলা করা হয়। মামলায় তার সাবেক স্ত্রী সামিরা হকসহ মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়।

মামলার আসামিদের মধ্যে সামিরা হক ও তার মা লতিফা হক লুসি ছাড়াও ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, অভিনেতা আশরাফুল হক ডন এবং আরও কয়েকজনের নাম রয়েছে।

অর্থাৎ, আগে যে মৃত্যুকে তদন্তকারী সংস্থার প্রতিবেদনে আত্মহত্যা বলা হয়েছিল, প্রায় ২৯ বছর পর সেটিই আদালতের আদেশে নতুন করে হত্যাকাণ্ড হিসেবে তদন্তের আওতায় আসে।

ডনের ওপর কেন নজর?

নতুন হত্যা মামলায় আশরাফুল হক ডন অন্যতম আসামি। মামলার তদন্ত চলাকালে ২০২৫ সালের অক্টোবরে আদালত ডন ও সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হকের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন।

এরপর আজ বিমানবন্দর থেকে ডনকে গ্রেপ্তার করা হলো। গ্রেপ্তারের পর তাকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এখন তদন্তের পরবর্তী ধাপে তার জিজ্ঞাসাবাদ এবং মামলার অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ যাচাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তবে আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত মামলার কোনো আসামিকেই দোষী বলা যাবে না।

বারবার পিছিয়েছে তদন্ত প্রতিবেদন

নতুন করে হত্যা মামলা হওয়ার পরও তদন্ত প্রক্রিয়া খুব দ্রুত এগোয়নি। ২০২৬ সালে একাধিকবার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ পিছিয়েছে।

সর্বশেষ ২৩ জুলাই ঢাকার একটি আদালত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নতুন তারিখ হিসেবে ৩০ আগস্ট নির্ধারণ করেন। ওই দিন তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক জিয়াউল মোরশেদ প্রতিবেদন জমা দিতে পারেননি। এর আগে কয়েক দফা সময় নেওয়া হয়েছিল।

ফলে এখন ডনের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন কবে জমা পড়ে এবং তদন্তে কী উঠে আসে—সেদিকেই নজর থাকবে।

সালমান শাহর মৃত্যুর রহস্য কি এবার খুলবে?

সালমান শাহর মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পেরিয়ে গেছে। এর মধ্যে তদন্ত হয়েছে একাধিকবার, এসেছে আত্মহত্যার প্রতিবেদন, পরিবার করেছে আপত্তি, আদালতে হয়েছে দীর্ঘ আইনি লড়াই। ২০২৫ সালে আবারও ঘটনাটি হত্যা মামলা হিসেবে তদন্তের নির্দেশ পাওয়ায় পুরোনো রহস্য নতুন করে সামনে আসে।

এখন সেই মামলার অন্যতম আসামি ডনের গ্রেপ্তার ঘটনাটিকে আরও আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

তবে ডনের গ্রেপ্তার মানেই সালমান শাহ হত্যার রহস্যের সমাধান হয়ে গেছে—এমনটা বলার সুযোগ নেই। মামলার তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ, জিজ্ঞাসাবাদ এবং আদালতের পরবর্তী কার্যক্রমের মধ্য দিয়েই পরিষ্কার হবে ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর আসলে কী ঘটেছিল।

তিন দশক ধরে যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন সালমান শাহর পরিবার ও ভক্তরা, তার উত্তর মিলবে কি না—এখন সেই অপেক্ষাই।

You may also like

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *