দেশের চলচ্চিত্রশিল্পে তারকাদের পারস্পরিক প্রতিযোগিতা, অনিরাপত্তা ও সহযোগিতার অভাব নিয়ে সরব হয়েছেন প্রযোজক ও জাজ মাল্টিমিডিয়ার কর্ণধার আব্দুল আজিজ। তাঁর মতে, দেশের নায়কদের মধ্যে এককভাবে শীর্ষে থাকার প্রবণতা বেশি। অন্য তারকারাও জনপ্রিয় হোক, তাঁদের সিনেমা ব্যবসা করুক, এমন মানসিকতা তৈরি না হলে চলচ্চিত্রশিল্পের সামগ্রিক উন্নয়ন কঠিন।
সোমবার (১২ অক্টোবর) একটি সিনেমার শুটিং সেটে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে এমন মন্তব্য করেন আব্দুল আজিজ। এ সময় দেশের নায়কদের মানসিকতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘আমাদের সিনেমার নায়কদের আমি বোকাই বলব।’
কেন এমন মন্তব্য, তার ব্যাখ্যায় এই প্রযোজক বলেন, একজন নায়ক যদি মনে করেন, অন্য সবাই হারিয়ে গেলে তিনিই একমাত্র শীর্ষ তারকা হয়ে থাকবেন, তাহলে সেটি ভুল ধারণা। বরং একটি চলচ্চিত্রশিল্পে একাধিক জনপ্রিয় তারকা থাকা প্রয়োজন। তাঁদের সিনেমা মুক্তি পেলে দর্শকের সামনে পছন্দের সুযোগ বাড়ে, যা শেষ পর্যন্ত পুরো ইন্ডাস্ট্রির ব্যবসায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
শাহরুখ-সালমানের উদাহরণ টানলেন আজিজ
দেশীয় তারকাদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার ঘাটতি বোঝাতে বলিউডের দুই সুপারস্টার শাহরুখ খান ও সালমান খানের উদাহরণ তুলে ধরেন আব্দুল আজিজ। তাঁর মতে, দুই তারকা দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছেন। তাঁরা একসঙ্গে সিনেমায় অভিনয় করেছেন, আবার বিভিন্ন সময় একে অন্যের কাজের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এতে কারও জনপ্রিয়তা কমে যায়নি।
ভারতীয় চলচ্চিত্রের তারকাদের পারস্পরিক সম্পর্কের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বড় তারকারা একে অন্যের সিনেমার প্রচারে অংশ নেন, প্রিমিয়ারে যান এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে একসঙ্গে উপস্থিত হন। এসব কর্মকাণ্ড তাঁদের অবস্থান দুর্বল করে না, বরং চলচ্চিত্রশিল্পের প্রতি দর্শকের আগ্রহ বাড়াতে সাহায্য করে।
বাংলা চলচ্চিত্রের তারকাদের উদাহরণ দিতেও ভোলেননি আজিজ। তাঁর ভাষ্য, পশ্চিমবঙ্গের অভিনেতা দেবের সিনেমা মুক্তি পেলে জিৎ প্রচারে অংশ নেন, আবার জিতের সিনেমার ক্ষেত্রেও দেবকে পাশে দেখা যায়। কিন্তু বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এমন পারস্পরিক সহযোগিতার চর্চা তুলনামূলকভাবে কম।
এমনকি একজন নায়িকার সিনেমা দেখতে অন্য নায়িকা যান কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন এই প্রযোজক। তাঁর মতে, তারকাদের মধ্যে অনিরাপত্তা ও হীনম্মন্যতা কাজ করার কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়।
শাকিব-নিশোকে নিয়ে সিনেমার পরিকল্পনা
আলাপচারিতায় শাকিব খান ও আফরান নিশোকে নিয়েও সিনেমা নির্মাণের সম্ভাবনার কথা জানান আব্দুল আজিজ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই দুই তারকাকে নিয়ে কাজ করার সুযোগ পেলে তিনি সিনেমা নির্মাণ করতে চান।
একাধিক তারকাকে একই সিনেমায় যুক্ত করার বিষয়টিকে তিনি চলচ্চিত্রের ব্যবসা বাড়ানোর সম্ভাব্য উপায় হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, জনপ্রিয় শিল্পীদের একসঙ্গে পর্দায় পাওয়া দর্শকের আগ্রহ তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি তারকারা একে অন্যের সিনেমার প্রচারে এগিয়ে এলে সেই আগ্রহ আরও বাড়বে।
কমছে প্রেক্ষাগৃহ, সংকুচিত হচ্ছে ব্যবসা
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ব্যবসা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আব্দুল আজিজ। তাঁর মতে, একসময় শাকিব খানের একটি সিনেমা থেকে প্রেক্ষাগৃহে দুই থেকে সাড়ে তিন কোটি টাকা পর্যন্ত টিকিট বিক্রির আয় হওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু বর্তমানে প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা কমে যাওয়ায় সেই পরিমাণ আয় করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রেক্ষাগৃহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি মাল্টিপ্লেক্সের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, চলচ্চিত্রের বাজার বড় করতে হলে শুধু তারকা তৈরি করলেই হবে না, বাড়াতে হবে সিনেমা প্রদর্শনের সুযোগও।
আব্দুল আজিজ মনে করেন, দেশে একাধিক জনপ্রিয় তারকা সক্রিয় থাকলে এবং তাঁদের সিনেমা নিয়মিত মুক্তি পেলে দর্শকের সামনে বিকল্প বাড়বে। পাশাপাশি প্রেক্ষাগৃহ ও মাল্টিপ্লেক্সের সংখ্যা বাড়ানো গেলে চলচ্চিত্রের ব্যবসাও সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে আব্দুল আজিজের বক্তব্যের মূল কথা, চলচ্চিত্রশিল্পে একজনের সাফল্য অন্যজনের ব্যর্থতার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। বরং তারকাদের পারস্পরিক সহযোগিতা, একাধিক সিনেমার নিয়মিত মুক্তি এবং প্রদর্শনব্যবস্থার সম্প্রসারণের মধ্য দিয়েই দেশের চলচ্চিত্রের বাজারকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।












