একটি গানের মিউজিক ভিডিও থেকে শুরু হয়েছিল পরিচয়। সেখান থেকে বন্ধুত্ব, প্রেম, তারপর বিয়ে। সংগীতশিল্পী প্রীতম হাসান ও অভিনেত্রী শাহতাজ মনিরা হাশেমের সম্পর্কের গল্পটা ছিল অনেকটাই আড়ালে। শোবিজ অঙ্গনে কাজ করলেও নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে খুব একটা প্রকাশ্যে আসেননি তারা। কিন্তু বিয়ের খবর প্রকাশ্যে আসার পর আলোচনায় আসে তাদের প্রেম ও বিয়ের আয়োজন। এবার সেই সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের ঘোষণা দিয়েছেন দুজন। পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা।
২০২৬ সালের ৪ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পৃথক পোস্টে একই বক্তব্য জানান প্রীতম ও শাহতাজ। তাদের ভাষ্য, দীর্ঘ সময় একসঙ্গে থাকার পর তারা উপলব্ধি করেছেন, পারস্পরিক বোঝাপড়ার কিছু বড় পার্থক্যের কারণে আলাদা পথে এগিয়ে যাওয়াই দুজনের জন্য ভালো। সিদ্ধান্তটি হঠাৎ করে নেওয়া হয়নি। নিজেদের মধ্যে আলোচনা এবং পরিবারের সমর্থন নিয়েই তারা বিচ্ছেদের প্রক্রিয়ায় এগোচ্ছেন। একসঙ্গে কাটানো সময় ও স্মৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে একে অপরের প্রতি সম্মান ও শুভকামনা অটুট থাকার কথাও বলেছেন তারা।

‘জাদুকর’ গানের শুটিংয়ে প্রথম পরিচয়
প্রীতম ও শাহতাজের পরিচয়ের সূত্র ২০১৭ সালের দিকে। প্রীতমের ‘জাদুকর’ গানের মিউজিক ভিডিওতে মডেল হিসেবে কাজ করেছিলেন শাহতাজ। সেই কাজের সূত্রেই দুজনের পরিচয়। পরবর্তী সময়ে বন্ধুত্ব গাঢ় হয়, আর সেই বন্ধুত্ব থেকেই তৈরি হয় প্রেমের সম্পর্ক।
তাদের প্রেমের বিষয়টি দীর্ঘদিন প্রকাশ্যে আসেনি। প্রায় পাঁচ বছর নিজেদের মতো করে সম্পর্ক চালিয়ে গেছেন তারা। গণমাধ্যমেও এ নিয়ে তেমন আলোচনা ছিল না। ফলে ২০২২ সালে তাদের বিয়ের খবর প্রকাশ্যে আসার পর অনেকের কাছেই তা ছিল চমক।
‘জাদুকর’ গানটি তাই তাদের জীবনের গল্পে বিশেষ জায়গা নিয়ে আছে। যে গানের কাজের সূত্রে পরিচয়, সেই পরিচয়ই একসময় পরিণত হয়েছিল জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কে। তবে সম্পর্কের শুরু নিয়ে যতটুকু জানা যায়, তার বাইরে ব্যক্তিগত জীবনের অনেক বিষয়ই তারা আড়ালে রেখেছেন।
ব্যাংকক থেকে শ্রীমঙ্গল, যেভাবে ঠিক হলো বিয়ের স্থান
বিয়ের আয়োজন নিয়ে শাহতাজের ইচ্ছা ছিল একটু ভিন্ন। প্রচলিত বড় আয়োজনের বদলে কাছের মানুষদের নিয়ে দেশের বাইরে বা কোনো সুন্দর গন্তব্যে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন তারা। প্রথমে তাদের পছন্দ ছিল থাইল্যান্ডের ব্যাংকক। কিন্তু শাহতাজের বাবা মারা যাওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। দেশের বাইরে গিয়ে বিয়ের আয়োজনের আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন তিনি। এরপর দেশের মধ্যেই উপযুক্ত জায়গা খুঁজতে শুরু করেন দুজন।
একপর্যায়ে সমুদ্রের পাশে বিয়ের আয়োজনের কথাও ভেবেছিলেন তারা। কক্সবাজার ছিল পছন্দের তালিকায়। কিন্তু অতিথিদের আপ্যায়ন, যাতায়াত এবং আয়োজনের নানা বাস্তব দিক বিবেচনা করে সেই পরিকল্পনা থেকেও সরে আসেন। শেষ পর্যন্ত চা-বাগান, পাহাড় আর সবুজে ঘেরা শ্রীমঙ্গলকে বিয়ের স্থান হিসেবে বেছে নেন তারা।
শ্রীমঙ্গলের গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফে বসেছিল তাদের বিয়ের আসর। ঢাকা থেকে দূরে প্রকৃতির কাছাকাছি এমন পরিবেশে বিয়ের আয়োজনের পেছনে ছিল নিজেদের মতো করে বিশেষ দিনটি উদ্যাপনের ইচ্ছা। পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের নিয়েই আয়োজন করতে চেয়েছিলেন তারা। তবে দূরে গিয়ে বিয়ের আয়োজনের সঙ্গে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের সবাই পরিচিত ছিলেন না। ফলে তাদের রাজি করানোও সহজ ছিল না।
শাহতাজের মা-ও আত্মীয়স্বজনের মধ্যে কাদের আমন্ত্রণ জানানো হবে, তা নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তায় ছিলেন। শেষ পর্যন্ত মেয়ের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিয়ে পরিবার সম্মতি দেয়। প্রীতম ও শাহতাজের চাওয়া ছিল, বিয়ের দিনটি যেন অতিথি আপ্যায়নের ব্যস্ততায় হারিয়ে না যায়। বর-কনে নিজেরাও যেন মুহূর্তগুলো উপভোগ করতে পারেন।
গায়েহলুদ থেকে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা
২০২২ সালের ২৭ অক্টোবর রাতে তাদের গায়েহলুদের আয়োজনের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অভিনেত্রী সুনেরাহ বিনতে কামালসহ ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের শেয়ার করা ছবিতে দেখা যায়, হলুদ পাঞ্জাবিতে প্রীতম এবং মেহেদি রাঙা হাতে শাহতাজ। এক ছবিতে শাহতাজের হাতে মেহেদি দিয়ে প্রীতমের নাম লেখার দৃশ্যও নজর কাড়ে।
পরদিন ২৮ অক্টোবর শ্রীমঙ্গলের গ্র্যান্ড সুলতান রিসোর্টে ঘনিষ্ঠজনদের উপস্থিতিতে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। বিয়ের খবর প্রথমে খুব বেশি প্রচার না পেলেও প্রীতম নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি প্রকাশ করার পর তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পরদিন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বিয়ের ছবি ও আয়োজনের খবর প্রকাশিত হয়।
বিয়ের পোশাক ও সাজসজ্জাতেও ছিল সরলতার ছাপ। শাহতাজ নিজেই তাদের দুজনের বিয়ের পোশাকের নকশা করেছিলেন। অতিথিদের পোশাকের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো ধরন চাপিয়ে না দিলেও রঙের ক্ষেত্রে প্যাস্টেল শেড বেছে নেওয়ার অনুরোধ ছিল। সাজসজ্জায় জাঁকজমকের বদলে নান্দনিক ও শান্ত পরিবেশকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
বিয়ের দিন দুপুরে আক্দের আনুষ্ঠানিকতা অনুষ্ঠিত হয়। সকালে আলোকচিত্রী এসে পৌঁছানোর পর শাহতাজের হাতে কনের সাজের জন্য সময় ছিল খুব কম। চুল সুন্দর করে বাঁধার ইচ্ছা থাকলেও শেষ পর্যন্ত খোলা চুলেই বউসাজে মঞ্চে আসেন তিনি। রাতে ছিল গোছানো বিবাহোত্তর সংবর্ধনা। দুই পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি শোবিজ অঙ্গনের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের উপস্থিতিতে পুরো আয়োজনটি হয়ে ওঠে স্মরণীয়।
একসঙ্গে পথচলার পর নতুন সিদ্ধান্ত
বিয়ের পরও প্রীতম ও শাহতাজকে বিভিন্ন সময়ে একসঙ্গে দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাগ করে নিয়েছেন নানা মুহূর্ত, ছবি ও স্মৃতি। তবে তাদের দাম্পত্য জীবনের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে খুব বেশি আলোচনা করেননি কেউই। বাইরে থেকে দেখা সম্পর্কের ছবির আড়ালে কী ধরনের বোঝাপড়া বা মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল, সে বিষয়ে প্রকাশ্যে বিস্তারিত কিছু জানাননি তারা।

বিচ্ছেদের ঘোষণায়ও ব্যক্তিগত কারণ নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যায় যাননি এই জুটি। শুধু জানিয়েছেন, পারস্পরিক বোঝাপড়ার কিছু বড় পার্থক্য তাদের আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্তে পৌঁছে দিয়েছে। তাই বিচ্ছেদের পেছনে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা বা একক কারণ আছে, এমন দাবি করার সুযোগ নেই।
তাদের ঘোষণায় স্পষ্ট, এই সিদ্ধান্তের মধ্যেও একে অপরের প্রতি সম্মান বজায় রাখতে চান তারা। পরিবারের সমর্থন নিয়ে বিবাহবিচ্ছেদের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি বন্ধু, সহকর্মী ও গণমাধ্যমের কাছে ব্যক্তিগত পরিসর ও গোপনীয়তা রক্ষার অনুরোধ জানিয়েছেন।
‘জাদুকর’ গানের শুটিংয়ে পরিচয় থেকে শুরু হওয়া সম্পর্ক একসময় চা-বাগানঘেরা শ্রীমঙ্গলে বিয়ের মধ্য দিয়ে নতুন রূপ পেয়েছিল। সেই পথচলার স্মৃতি থাকলেও এবার জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ে আলাদাভাবে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রীতম ও শাহতাজ।












