৬০ বছরে পা দেওয়ার অনুভূতি নিয়ে জাহিদ হাসান বলেন, বয়সের হিসাবটা তার কাছেও কিছুটা অবিশ্বাস্য মনে হয়। পরিবারের সবার মধ্যে ছোট হওয়ায় বয়স বাড়লেও আপনজনদের কাছে এখনো তিনি সেই ছোট মানুষটিই রয়ে গেছেন। জীবনের ভুল নিয়ে কোনো রাখঢাক নেই জাহিদের। তিনি মনে করেন, মানুষ মাত্রই ভুল করে। অতীতে নিজের কোনো আচরণে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন এই অভিনেতা। এখন তার চাওয়া, জীবনের বাকি সময়টা মানুষের উপকারে লাগাতে।

জাহিদ হাসানের ভাষায়, জীবনে অনেক ভুল করেছেন তিনি। অতীতের ভুল কিংবা নিজের কোনো কথায় বা কাজে কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে তিনি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আগামী দিনগুলো মানুষের জন্য কিছু করে কাটাতে চান তিনি।
নিজের ভালো থাকার পাশাপাশি আশপাশের মানুষদের নিয়েও ভালো থাকার চেষ্টা করেন জাহিদ। তার বিশ্বাস, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা থাকলে ব্যক্তি ও সমাজের পাশাপাশি দেশেরও উন্নতি সম্ভব।

জাহিদ হাসান দুই সন্তানের বাবা। তার মেয়ে বর্তমানে লন্ডনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজনেস ম্যানেজমেন্ট নিয়ে পড়াশোনা করছেন। ছেলে এ লেভেল শেষ করেছেন। উচ্চশিক্ষার জন্য শিগগিরই ছেলেও দেশের বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
দেশের বাইরে থাকা মেয়েকে নিয়মিত মনে পড়ে জাহিদের। ফোনে মেয়ের সঙ্গে কথা বলার সময় সে যখন বাড়ির খাবার, বাবা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের মিস করার কথা জানায়, তখন আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। এমনিতেই জাহিদ নিজেকে আবেগপ্রবণ মানুষ হিসেবে মনে করেন। ভালো কিছু শুনলে যেমন তার চোখে পানি আসে, তেমনি অন্যের কষ্ট দেখলেও সহজেই আবেগী হয়ে পড়েন।
শৈশবের জন্মদিনের স্মৃতিও এখনো মনে আছে এই অভিনেতার। পরিবারের ছোট সন্তান হওয়ায় জন্মদিনে বাড়িতে থাকত বিশেষ আয়োজন। মা রান্না করতেন পায়েসসহ নানা খাবার। থাকত কেক, চানাচুর, কলাসহ আরও অনেক কিছু।

তবে আশির দশকের শেষ দিকে অভিনয়ের স্বপ্ন নিয়ে ঢাকায় আসার পর জন্মদিনের সেই আনন্দের চিত্র বদলে যায়। মেসজীবনে তখন কয়েকজন মিলে একটি ঘরে থাকতেন। ১৯৮৯ সালের এক জন্মদিনে ধানমন্ডির একটি মেসে নিজের ঘর পরিষ্কার করছিলেন তিনি। খাবারের ব্যবস্থাও সব সময় ভালো থাকত না। ফলে অনেক সময় নিজেদেরই রান্না করে খেতে হতো।
সেই জন্মদিনে মেসের এক সহবাসীর আইনজীবী বাবা জাহিদকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, এমন একটি দিন আসবে, যখন সারা দেশের মানুষ তার জন্মদিন পালন করবে। অভিনয়ে জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর বিভিন্ন গণমাধ্যমে নিজের জন্মদিন নিয়ে খবর প্রকাশিত হলে সেই কথাটিই বারবার মনে পড়ে জাহিদের।
অভিনয়ের স্বপ্ন নিয়েই সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসেছিলেন তিনি। থিয়েটারে কাজের শুরুতে দলের বিভিন্ন কাজ করতে হয়েছে তাকে। ঘর পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে নানা দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তী সময়ে নাট্যকেন্দ্র গড়ে ওঠার সঙ্গে তার অভিনয়জীবনও নতুন পথে এগিয়ে যায়।

জাহিদের মতে, মেসজীবনের নানা অভিজ্ঞতা তাকে জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। কষ্টের সময় পেরিয়েই সুখের মূল্য বোঝা যায় বলে মনে করেন তিনি। জীবনে কোনো অর্জনই সহজে আসে না, আর কঠিন সময়ের পর পাওয়া সাফল্যের আনন্দও আলাদা।
মেসে থাকার সময় থেকেই অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেওয়া এবং ছাড় দেওয়ার অভ্যাস তৈরি হয়েছিল তার। এমনকি নিজের সাবান বা শ্যাম্পু অন্যরা ব্যবহার করলেও তাতে আপত্তি করতেন না। তার কাছে সেটি ছিল একসঙ্গে থাকার জীবনের স্বাভাবিক একটি বিষয়।

ছয় দশকের জীবনে অভিনয়ের পাশাপাশি নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছেন জাহিদ হাসান। এখন তার প্রত্যাশা, জীবনের বাকি সময়টা মানুষের ভালোবাসা ও কল্যাণের কাজে আরও বেশি ব্যয় করতে পারবেন।










