ফরিদার গানকে কীভাবে আলাদা করে দেখতেন জানাতে গিয়ে ফেরদৌসী রহমান বলেন, অন্যরা অনেক সময় শুধু কণ্ঠ দিয়ে গান গাইলেও ফরিদার গানের মধ্যে ছিল অন্যরকম গভীরতা। গানের প্রতিটি কথা বুঝে, অনুভব করে তারপর গাইতেন তিনি। সেই কারণেই তাঁর কণ্ঠে লালনের গান শুনলে মনে হতো, গানটি যেন তাঁর ভেতর থেকেই উঠে আসছে। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে ফরিদার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল ফেরদৌসী রহমানের। তাঁদের সম্পর্ক কেবল সহশিল্পীর ছিল না; অনেকটা বড় বোন ও ছোট বোনের মতোই ছিল। শিল্পী ফরিদা আর ব্যক্তি ফরিদার মধ্যেও কোনো ফারাক দেখেননি তিনি। তাঁর চোখে দুজনেই ছিলেন সহজ, সরল ও নির্মোহ।

গান থেমেছে, সাধনা থামেনি
ফরিদা পারভীনের চলে যাওয়ার এক বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর সংগীতচর্চার পথ থেমে নেই। প্রায় ১৭ বছর আগে জীবনসঙ্গী গাজী আবদুল হাকিমকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকার তেজগাঁওয়ে ‘অচিন পাখি সংগীত একাডেমি’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ফরিদা। লোকগানের পাশাপাশি সেখানে নজরুলসংগীত, আধুনিক ও শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম দেওয়া হয়। সংগীতের বাইরে ছবি আঁকা, গিটার ও তবলা শেখানোর ব্যবস্থাও রয়েছে। বর্তমানে তিন বছর বয়সী শিশু থেকে শুরু করে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা প্রায় ৮০ জন শিক্ষার্থী এখানে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।

একসময় যে প্রতিষ্ঠানটি দুজন মিলে পরিচালনা করতেন, এখন একাই তার দায়িত্ব সামলাচ্ছেন গাজী আবদুল হাকিম। তাঁর কাছে ফরিদার অনুপস্থিতি এমন এক শূন্যতা, যা কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়। তবু ফরিদার স্বপ্নকে সামনে রেখে প্রতিষ্ঠানটি চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি।
ফরিদা চাইতেন বাংলা লোকগান দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের নানা প্রান্তে পৌঁছে যাক। তাঁর রেখে যাওয়া শিক্ষার্থী ও সংগীতচর্চার মধ্য দিয়ে সেই স্বপ্নকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
লালনের গানে নিবিড় সাধনা
নাটোরের সিংড়ায় জন্ম ফরিদা পারভীনের। শৈশবে মাগুরায় ওস্তাদ কমল চক্রবর্তীর কাছে সংগীতে হাতেখড়ি। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকজন গুণী শিল্পীর কাছে তালিম নেন তিনি।
১৯৬৮ সালে রাজশাহী বেতারে নজরুলসংগীতশিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন ফরিদা। তবে স্বাধীনতার পর কুষ্টিয়ায় থাকার সময় তাঁর সংগীতজীবনে আসে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। লালনসংগীতের প্রতি তৈরি হয় গভীর আকর্ষণ।
১৯৭৩ সালে মোকছেদ আলী সাঁইয়ের কাছে ‘সত্য বল সুপথে চল’ গান শেখার মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর লালনসংগীতের নিবিড় সাধনা। এরপর খোদা বক্স সাঁই, ব্রজেন দাস, বেহাল সাঁই, ইয়াছিন সাঁই ও করিম সাঁইয়ের কাছ থেকেও লালনের গান ও দর্শনের তালিম নেন তিনি।
লালন ফকিরের বাণী ও দর্শনকে সাধারণ শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ফরিদা পারভীনের অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর কণ্ঠে লালনের গান পেয়েছে আলাদা জনপ্রিয়তা ও গভীরতা।
সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮৭ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন ফরিদা পারভীন। পরে ১৯৯৩ সালে ‘অন্ধ প্রেম’ চলচ্চিত্রের ‘নিন্দার কাঁটা’ গানের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।
প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে নানা আয়োজন
ফরিদা পারভীনের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আজ বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল ও সংগীত প্রতিষ্ঠানে আয়োজন করা হয়েছে বিশেষ অনুষ্ঠান।
বাংলাদেশ বেতারে তাঁকে নিয়ে থাকছে এক ঘণ্টার বিশেষ আয়োজন। সেখানে ফরিদা পারভীনের গান পরিবেশন করবেন নাসরিন আক্তার বিউটি ও সাজিয়া সুলতানা পুতুল। বাঁশিতে থাকবেন গাজী আবদুল হাকিম।
চ্যানেল আইয়ের বিশেষ অনুষ্ঠানেও ফরিদাকে স্মরণ করা হবে। সেখানে গান পরিবেশনের পাশাপাশি তাঁকে নিয়ে স্মৃতিচারণা করবেন গাজী আবদুল হাকিম।
সন্ধ্যায় ‘অচিন পাখি সংগীত একাডেমি’তেও অনুষ্ঠিত হবে স্মরণসভা। এতে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীরা ফরিদা পারভীনের জীবন, সংগীতসাধনা ও অবদান নিয়ে আলোচনা করবেন।
এ ছাড়া আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের একটি মিলনায়তনে ফরিদা পারভীনের গান ও জীবন নিয়ে আরও একটি আয়োজন হওয়ার কথা রয়েছে।
এক বছর ধরে তাঁর কণ্ঠে নতুন কোনো গান শোনা যায় না। কিন্তু তাঁর গাওয়া গান, লালনের বাণী এবং শিষ্যদের কণ্ঠে সেই সাধনার ধারাবাহিকতা এখনো চলমান। তাই শারীরিকভাবে না থাকলেও সংগীতের ভেতর দিয়ে ফরিদা পারভীন যেন এখনো একইভাবে বলে চলেছেন গান শুধু গাওয়ার বিষয় নয়, তাকে অনুভবও করতে হয়।












