গত ২৫ মে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক মো. জাহাঙ্গীর আলম। আগামী ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতউল্লাহর আদালতে প্রতিবেদনটির ওপর শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। তবে পিবিআইয়ের এই প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট নয় বাদীপক্ষ। তাদের আইনজীবী শুভ্র সিনহা রায় জানিয়েছেন, তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আদালতে নারাজির আবেদন করা হবে। পাশাপাশি অন্য কোনো তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে মামলাটি পুনঃতদন্তের আবেদনও জানাবেন তারা।
যেভাবে শুরু হয় শাড়ি নিয়ে বিরোধ
ফ্যাশন ডিজাইনার আয়েশাহ আনুম ফায়যাহ সানায়া চৌধুরী ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর তানজিন তিশার বিরুদ্ধে আদালতে মামলাটি করেন। অভিযোগে বলা হয়, গুলশানের ১২৭ নম্বর সড়কে সানায়ার ফ্যাশন হাউজ ও স্টুডিও রয়েছে।
২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর একটি অনুষ্ঠানে পরার জন্য সানায়ার কাছ থেকে ৭৫ হাজার টাকা দামের একটি শাড়ি নেন তানজিন তিশা। অনুষ্ঠান শেষে শাড়িটি ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও তা ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন সানায়া। শাড়িটি ফেরত চেয়ে ১৫ ডিসেম্বর ফেসবুক মেসেঞ্জারে তিশাকে বার্তা পাঠানোর কথাও মামলায় উল্লেখ করেন তিনি। সানায়ার অভিযোগ, শাড়ি ফেরত চাওয়ার পর তানজিন তিশা তাকে গালিগালাজ ও প্রাণনাশের হুমকি দেন। পরে ২০২৫ সালের মার্চে দুটি অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে তিশার সঙ্গে দেখা হলে সানায়া আবারও শাড়িটি ফেরত চান বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়। এরপর নভেম্বর মাসে মেসেঞ্জারে ফোন করে মামলা করলে সামাজিকভাবে হেয় করার হুমকি দেওয়া হয়েছে এমন অভিযোগও করেন সানায়া। এ ঘটনায় ১২ নভেম্বর গুলশান থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন তিনি।
তদন্তে পিবিআইয়ের বক্তব্য
মামলার তদন্তে দুই পক্ষের মধ্যে ফেসবুক মেসেঞ্জারে হওয়া কথোপকথনের স্ক্রিনশটসহ বিভিন্ন তথ্য পর্যালোচনা করে পিবিআই। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সানায়া ও তানজিন তিশার মধ্যে আগে থেকেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। বিভিন্ন ফ্যাশন ও অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠান এবং ভ্রমণের সূত্রে তাদের পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর তিশা তার সাবেক চালকের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের জন্য শাড়িটি সংগ্রহ করেন। শাড়ি ফেরত চেয়ে ১৫ ডিসেম্বর সানায়া মেসেঞ্জারে বার্তা পাঠালেও তিশা সেটি দেখেননি বলে তদন্তে উঠে আসে। পরবর্তী সময়ের কথোপকথনও তদন্তের অংশ হিসেবে পর্যালোচনা করা হয়। ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর সানায়া আবার শাড়িটি ফেরত দেওয়ার কথা জানান। তিশা তখন কোন শাড়ির কথা বলা হচ্ছে জানতে চান। পরে শাড়ির ছবি পাঠানো হলে তিশা জানান, বিষয়টি তার মনে নেই এবং তিনি খুঁজে দেখে জানাবেন। তদন্ত কর্মকর্তাকে দেওয়া বক্তব্যে তানজিন তিশা জানান, সানায়ার কাছ থেকে এর আগেও কয়েকটি শাড়ি নিয়েছিলেন এবং সেগুলো পরে ফেরত দিয়েছিলেন। শাড়ি নেওয়ার জন্য কোনো অর্থও দেওয়া হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।

তিশার বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় পার হয়ে যাওয়ায় ৭৫ হাজার টাকার শাড়িটির কথা তিনি ভুলে গিয়েছিলেন। তার সাবেক চালক শাড়িটি ফেরত না দিয়ে চাকরি ছেড়ে চলে যাওয়ার পর তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে সানায়ার কাছ থেকে শাড়িটি ফেরত দেওয়ার ঠিকানা জানার চেষ্টা করেন। মামলার বিষয়টি জানার পর ডাকযোগে শাড়িটি ফেরত পাঠানো হয়েছে বলেও তদন্ত কর্মকর্তাকে জানান তিশা। পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩১ মার্চ ডাকযোগে শাড়িটি ফেরত পাঠান তানজিন তিশা। ফলে শাড়িটি আত্মসাতের উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছিল এমন অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে তদন্ত কর্মকর্তার মত।
হুমকির অভিযোগেও প্রমাণ মেলেনি
তানজিন তিশার বিরুদ্ধে হুমকির অভিযোগের বিষয়টিও তদন্ত করে পিবিআই। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর তিশার পাঠানো মেসেজের শেষাংশে শাড়িটি ফেরত পাঠানোর ঠিকানা জানতে চাওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে সানায়ার সুন্দর জীবন কামনা করা হয়। এই কথোপকথন ও অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করে হুমকি দেওয়ার অভিযোগেরও প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুনঃতদন্ত চাইবে বাদীপক্ষ
পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন মামলার বাদী সানায়া চৌধুরী। তার দাবি, তদন্তের সময় তিনি সাক্ষীদের তথ্যের পাশাপাশি হুমকির অডিও রেকর্ডসহ বিভিন্ন প্রমাণ তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দিয়েছেন। তারপরও অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে প্রতিবেদন দেওয়ায় তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। বাদীপক্ষের আইনজীবী শুভ্র সিনহা রায় বলেন, তারা পিবিআইয়ের প্রতিবেদন মেনে নিচ্ছেন না। আদালতে নারাজির আবেদন করার পাশাপাশি মামলাটি অন্য কোনো সংস্থার মাধ্যমে পুনঃতদন্তের আবেদন জানানো হবে।

তানজিনের বিরুদ্ধে আরও একটি শাড়ির মামলা
শাড়ি নিয়ে তানজিন তিশার বিরুদ্ধে এটি দ্বিতীয় মামলা। এর আগে অনলাইন ফ্যাশন পেজ ‘অ্যাপোনিয়া’র কাছ থেকে প্রায় ২৮ হাজার ৮০০ টাকা মূল্যের একটি শাড়ি নেওয়া এবং সেটির প্রচার ও মূল্য পরিশোধের প্রতিশ্রুতি পূরণ না করার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। ওই মামলায় তদন্তের দায়িত্ব পায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তদন্ত প্রতিবেদনে তিশার বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা জানানো হয়।

পরে আদালত ওই প্রতিবেদন আমলে নিয়ে তানজিন তিশার বিরুদ্ধে সমন জারি করেন। গত ১৩ আগস্ট ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুয়েল রানার আদালতে হাজির হয়ে জামিন নেন অভিনেত্রী।












