যদি শেষ পর্যন্ত ইধিকা ‘নিঃস্ব’-এর নায়িকা হিসেবে চূড়ান্ত হন, তাহলে এটি হবে শাকিব-ইধিকা জুটির তৃতীয় সিনেমা। এরই মধ্যে একাধিক সূত্র ইধিকার যুক্ত হওয়ার কথা জানিয়েছে। তবে নির্মাতা মেহেদী হাসান হৃদয় আনুষ্ঠানিকভাবে নায়িকার নাম ঘোষণা করেননি। পরিকল্পনা অনুযায়ী সিনেমাটির শুটিং অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে শুরু হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো মাত্র দুটি সিনেমার পর এই জুটি নিয়ে এত আলোচনা কেন?
শুরুটা ছিল ‘প্রিয়তমা’ দিয়ে
ইধিকা পালের বড় পর্দার যাত্রাই শুরু হয়েছিল শাকিব খানের বিপরীতে। ২০২৩ সালে হিমেল আশরাফ পরিচালিত ‘প্রিয়তমা’য় অভিনয়ের আগে তিনি কলকাতার টেলিভিশন দর্শকের কাছে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু শাকিবের নায়িকা হিসেবে বাংলাদেশের সিনেমায় অভিষেক তাঁর ক্যারিয়ারে বড় পরিবর্তন এনে দেয়।

শুরুতে অবশ্য ইধিকাকে শাকিবের বিপরীতে নেওয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু সিনেমা মুক্তির পর সেই সংশয় অনেকটাই উল্টো চিত্র তৈরি করে। দর্শকের কাছে ‘প্রিয়তমা’ ও ইধিকা দুটিই দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ইধিকা নিজেই এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, সিনেমাটি মুক্তির পর তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনুসারী ও দর্শকের সাড়া অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়ে যায়। এমনকি কলকাতাতেও মানুষ তাঁকে ‘প্রিয়তমা’ নামে ডাকতে শুরু করেন। এখানেই তৈরি হয় শাকিব-ইধিকা জুটির প্রথম বড় সাফল্যের ভিত্তি।
‘প্রিয়তমা’র পর অপেক্ষা ছিল আবার কবে?
একটি সিনেমার সাফল্যের পর একই জুটিকে আবার পর্দায় আনা ঝুঁকিপূর্ণও হতে পারে। কারণ দর্শকের প্রত্যাশা তখন বেড়ে যায়। কিন্তু শাকিব ও ইধিকার ক্ষেত্রে সেই ঝুঁকিটাই নেওয়া হয়।

মেহেদী হাসান হৃদয়ের ‘বরবাদ’-এ আবারও জুটি বাঁধেন তাঁরা। এবার গল্পের আবহও ছিল ভিন্ন। ‘প্রিয়তমা’র আবেগ ও প্রেমের জায়গা থেকে ‘বরবাদ’-এ তাঁদের দেখা যায় অ্যাকশন ও রোমান্টিকতার ভিন্ন মিশেলে। ‘বরবাদ’-এর ‘দ্বিধা’ গান প্রকাশের পরও তাঁদের রসায়ন নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়। গানে শাকিব ও ইধিকার উপস্থিতি দর্শকের আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ প্রথম সিনেমায় তৈরি হওয়া জনপ্রিয়তাকে দ্বিতীয় সিনেমায় অন্য আবহে ধরে রাখার চেষ্টা ছিল তাঁদের জুটির ক্ষেত্রে।
ইধিকার জন্য শাকিব কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
ইধিকা নিজেই শাকিবের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতাকে তাঁর ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখেছেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি শাকিবকে পেশাদার, বিনয়ী ও নিরহংকার অভিনেতা হিসেবে বর্ণনা করেন। বড় তারকার সঙ্গে প্রথম কাজের সময় যে নার্ভাসনেস ছিল, শাকিবের সহযোগিতায় সেটি দ্রুত কেটে যায় বলেও জানিয়েছিলেন তিনি। আরেক সাক্ষাৎকারে ইধিকা সরাসরি বলেছেন, বাংলাদেশের দর্শক তাঁকে চিনেছেন শাকিব খানের জন্যই। এমনকি শাকিবের অনেক গুণের মধ্যে মানুষকে অনুপ্রাণিত করার ক্ষমতাকেও আলাদা করে উল্লেখ করেছেন তিনি।

তবে ইধিকার সাফল্যকে শুধু শাকিবের জনপ্রিয়তার ফল হিসেবে দেখলে তাঁর নিজের অবদানও ছোট করে দেখা হবে। ‘প্রিয়তমা’র পর তিনি নিজের জায়গা তৈরি করেছেন এবং দুই বাংলাতেই তাঁর পরিচিতি বেড়েছে। শাকিবের সঙ্গে জুটি তাঁর ক্যারিয়ারের দরজা খুলে দিলেও সেই জায়গা ধরে রাখার জন্য তাঁর নিজের অভিনয় ও পর্দার উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে।
শাকিবের সঙ্গে আবার কাজ করতে কেন রাজি ইধিকা?
‘প্রিয়তমা’র পর ইধিকাকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, শাকিবের সঙ্গে আবার কাজ করবেন কি না, তাঁর উত্তর ছিল ইতিবাচক। গল্পের প্রয়োজনে তাঁকে দরকার হলে আবারও কাজ করতে চান বলে জানিয়েছিলেন তিনি। একই সঙ্গে দর্শকেরাও তাঁদের জুটিকে আবার দেখতে চান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়ায় সেটি তিনি দেখেছেন বলেও জানান। সময়ের ব্যবধানে সেই চাওয়াটাই যেন আরও জোরালো হয়েছে।
এবার ‘নিঃস্ব’ কেন আলাদা?
শাকিব-ইধিকা জুটির সম্ভাব্য তৃতীয় সিনেমা ‘নিঃস্ব’ নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার পর বিষয়টি আর শুধু একটি নতুন সিনেমার খবর হিসেবে থাকেনি। এটি এখন একটি প্রতিষ্ঠিত জুটির সম্ভাব্য হ্যাটট্রিক হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। মেহেদী হাসান হৃদয়ের সঙ্গে শাকিবের এটি আবারও কাজ হতে যাচ্ছে। আর ইধিকা যুক্ত হলে নির্মাতার সঙ্গেও তাঁর দ্বিতীয় কাজ হবে। সিনেমাটির শুটিং অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে শুরু হওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

তবে এখানে একটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ-নির্মাতা এখনো প্রকাশ্যে নায়িকার নাম ঘোষণা করেননি। ফলে ‘নিঃস্ব’-এ ইধিকার অভিনয়ের বিষয়টি আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পরই চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হবে।
এই জুটির আসল শক্তি কোথায়?
শাকিব খান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় তারকাদের একজন। তাঁর সিনেমাকে ঘিরে এমনিতেই দর্শকের আগ্রহ থাকে। অন্যদিকে ইধিকা এমন একজন অভিনেত্রী, যাঁর বাংলাদেশের সিনেমায় অভিষেকই হয়েছিল শাকিবের বিপরীতে। ফলে তাঁদের জুটির ক্ষেত্রে দুটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করে শাকিবের বিশাল দর্শকভিত্তি এবং ইধিকার নতুন প্রজন্মের কাছে তৈরি হওয়া গ্রহণযোগ্যতা।এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পর্দার রসায়ন। ‘প্রিয়তমা’য় যে সম্পর্ক দর্শককে আবেগী করেছে, ‘বরবাদ’ সেই জুটিকে অন্য আবহে দেখিয়েছে। ফলে তৃতীয় সিনেমায় তাঁদের সম্পর্কের ধরন, চরিত্র এবং গল্প কেমন হবে এটাই এখন কৌতূহলের জায়গা।
শুধু জুটি নয়, ইধিকার ক্যারিয়ারেরও নতুন অধ্যায়
শাকিবের সঙ্গে পরপর দুটি সিনেমায় অভিনয়ের পর ইধিকা আর শুধু ‘শাকিবের নায়িকা’ পরিচয়ে আটকে থাকেননি। দুই বাংলার প্রযোজকদের কাছেও তাঁর চাহিদা তৈরি হয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এটাই সম্ভবত এই জুটির গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক। ‘প্রিয়তমা’ ইধিকাকে বাংলাদেশের দর্শকের কাছে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল; ‘বরবাদ’ সেই পরিচিতিকে আরও শক্ত করেছে। আর ‘নিঃস্ব’ সত্যিই হলে, সেটি হতে পারে তাঁর ক্যারিয়ারে শাকিব-অধ্যায়ের তৃতীয় বড় সংযোজন।
হ্যাটট্রিক কি সাফল্যের নিশ্চয়তা?
দুটি সফল সিনেমার পর তৃতীয়বার একই জুটিকে পর্দায় আনা মানেই সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়। বরং এবার প্রত্যাশার চাপ আরও বেশি। দর্শক চাইবে নতুন গল্প, নতুন চরিত্র এবং আগের দুই সিনেমার পুনরাবৃত্তি নয় নতুন কোনো রসায়ন। শাকিব–ইধিকা জুটির সামনে তাই চ্যালেঞ্জটাও বড়। ‘প্রিয়তমা’ তাঁদের পরিচয় তৈরি করেছে, ‘বরবাদ’ সেই জুটিকে পুনরায় গ্রহণযোগ্যতার পরীক্ষা দিয়েছে। আর ‘নিঃস্ব’ হলে সেটি হবে সেই সম্পর্কের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

শেষ পর্যন্ত সিনেমা কতটা সফল হবে, তা নির্ধারণ করবে গল্প, নির্মাণ, অভিনয় ও দর্শকের প্রতিক্রিয়া। তবে একটি বিষয় ইতিমধ্যেই স্পষ্ট শাকিব খান ও ইধিকা পাল এখন আর শুধু দুই তারকার নাম নন; তাঁদের জুটিকে ঘিরে আলাদা প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। ‘প্রিয়তমা’ থেকে ‘বরবাদ’, আর সেখান থেকে সম্ভাব্য ‘নিঃস্ব’ এই যাত্রা তাই শুধু একটি জুটির পর্দায় ফেরার গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের দর্শকের পছন্দ কীভাবে একটি জুটিকে বারবার বড় পর্দায় ফিরিয়ে আনতে পারে, তারও একটি উদাহরণ।












