পর্দায় রোমান্টিক নায়ক হিসেবে যে মুখটি একসময় দর্শকের কাছে আলাদা জায়গা করে নিয়েছিল, সেই জিয়াউল ফারুক অপূর্বর পথচলা অবশ্য শুরু হয়েছিল অন্য স্বপ্ন নিয়ে। ছোটবেলায় তাঁর ইচ্ছা ছিল প্রকৌশলী হওয়ার। কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে পড়াশোনাও করেছিলেন। অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেওয়ার পরিকল্পনা তখন ছিল না। তবে ছোটবেলা থেকেই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল আবৃত্তি, গান ও মঞ্চের বিভিন্ন আয়োজনে অংশ নিতেন।
মডেলিং দিয়ে যাত্রা, এরপর অভিনয়ে
২০০৪ সালে ‘ইউ গট দ্য লুক’ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ‘মিস্টার বাংলাদেশ’ খেতাব অর্জন করেন অপূর্ব। এই সাফল্য তাঁকে মডেলিংয়ের জগতে পরিচিত করে। এরপর অমিতাভ রেজা চৌধুরীর নির্মিত একটি নেসক্যাফের বিজ্ঞাপনে কাজ করেন। বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি তাঁর মডেলিংও দ্রুত দর্শকের নজর কাড়ে।

তবে ছোট পর্দায় তাঁর প্রকৃত পরিচিতি তৈরি হয় অভিনয়ের মাধ্যমে। ২০০৬ সালে গাজী রাকায়েতের নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে নাট্যজগতে যাত্রা শুরু করেন তিনি। এরপর একের পর এক নাটক ও টেলিফিল্মে কাজ করতে করতে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দর্শকের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। অপূর্বর জনপ্রিয়তার অন্যতম বড় কারণ ছিল তাঁর স্বাভাবিক অভিনয় এবং রোমান্টিক চরিত্রে সাবলীল উপস্থিতি। একটা সময় টেলিভিশনের নাটকে তরুণ প্রেমিক বা মধ্যবিত্ত পরিবারের আবেগী যুবকের চরিত্রে তাঁর উপস্থিতি দর্শকের কাছে প্রায় আলাদা একটি ঘরানা তৈরি করে।
‘রোমান্টিক হিরো’ থেকে অন্যরকম অপূর্ব
শুধু রোমান্টিক চরিত্রে আটকে থাকেননি অপূর্ব। সময়ের সঙ্গে অভিনয়ের ধরনেও পরিবর্তন এনেছেন। দর্শকের চাহিদা যেমন বদলেছে, তেমনি নিজেকেও নতুন চরিত্রে পরীক্ষা করেছেন তিনি। ২০১০-এর দশকে তাঁর অভিনীত বেশ কিছু নাটক ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ‘বড় ছেলে’ এর অন্যতম উদাহরণ। নাটকটি তাঁকে নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছেও আরও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। ২০২৬ সালে ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর সঙ্গে আলাপচারিতায়ও অপূর্ব তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে দর্শকের ভালোবাসাকে নিজের পথচলার অন্যতম বড় শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

অভিনেতার ভাষায়, কাজের চাপে কখনো ক্লান্তি এলেও দর্শকের ভালোবাসা তাঁকে আবার সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দেয়। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে দর্শকের সঙ্গে তাঁর এই সম্পর্কই সম্ভবত সবচেয়ে বড় অর্জন।
শুধু অভিনয় নয়, নির্মাণেও আগ্রহ
অভিনয়ের পাশাপাশি নির্মাণের সঙ্গেও নিজেকে যুক্ত করেছিলেন অপূর্ব। নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গড়ে ২০১২ সালে টেলিফিল্ম ‘ব্যাকডেটেড’ নির্মাণের মাধ্যমে পরিচালনায়ও হাতেখড়ি হয় তাঁর। একই সঙ্গে গানেও নিজের আগ্রহের পরিচয় দিয়েছেন। অর্থাৎ অভিনয় তাঁর প্রধান পরিচয় হলেও শিল্পের অন্য মাধ্যমগুলো নিয়েও কাজ করার আগ্রহ শুরু থেকেই ছিল।
বড় পর্দায় যাত্রা, তবে পথটা সহজ ছিল না
টেলিভিশনে তুমুল জনপ্রিয়তার পর স্বাভাবিকভাবেই বড় পর্দায় অপূর্বর যাত্রা নিয়ে দর্শকের আগ্রহ তৈরি হয়। ২০১৫ সালে ‘গ্যাংস্টার রিটার্নস’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় তাঁর। পরে ‘মায়াশালিক’-এর মতো ডিজিটাল চলচ্চিত্রেও কাজ করেন।

তবে চলচ্চিত্রে তাঁর যাত্রা নাটকের মতো ধারাবাহিক হয়নি। এক সাক্ষাৎকারে অপূর্ব নিজেই জানিয়েছেন, সিনেমায় কাজ করার ক্ষেত্রে কখনো গল্প, কখনো পারিশ্রমিকসহ নানা বিষয় তাঁর পছন্দের সঙ্গে মেলেনি। ফলে ছোট পর্দাই দীর্ঘ সময় তাঁর প্রধান কর্মক্ষেত্র হয়ে থেকেছে। এরপরও সিনেমা থেকে পুরোপুরি দূরে থাকেননি। কলকাতার সিনেমা ‘চালচিত্র: দ্য ফ্রেম ফাতাল’-এও অভিনয় করেছেন তিনি।
ওটিটিতে বদলে গেল পরিচিতি
অপূর্বর ক্যারিয়ারে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে। ‘মায়াশালিক’, ‘বুকের মধ্যে আগুন’, ‘গোলাম মামুন’সহ বিভিন্ন ওয়েবভিত্তিক কাজে তাঁকে আগের পরিচিত রোমান্টিক নায়ক ইমেজের বাইরে দেখা গেছে।

বিশেষ করে ‘বুকের মধ্যে আগুন’ ও ‘গোলাম মামুন’-এ অপেক্ষাকৃত গম্ভীর ও জটিল চরিত্রে অভিনয় করে নিজের অভিনয়ক্ষমতার অন্য দিক দেখিয়েছেন তিনি। ‘দ্য ডেইলি স্টার’-ও তাঁর টেলিভিশন থেকে ওটিটিতে বিস্তৃত হওয়ার বিষয়টি আলাদা করে উল্লেখ করেছে।
এ পরিবর্তনটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা কোনো অভিনেতার জন্য নিজের প্রতিষ্ঠিত ইমেজ ভেঙে নতুন চরিত্রে যাওয়ার ঝুঁকি নেওয়া সহজ নয়। অপূর্ব সেই ঝুঁকিটাই ধীরে ধীরে নিয়েছেন।

সহশিল্পীদের সঙ্গে রসায়নেও সফল
অপূর্বর দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বিভিন্ন অভিনেত্রীর সঙ্গে তাঁর জুটি দর্শকের কাছে জনপ্রিয় হয়েছে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি তারিন জাহানের সঙ্গে নিজের রসায়নকে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। বর্তমান প্রজন্মের দর্শকের কাছে মেহজাবীনের সঙ্গে তাঁর জুটিও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, শেষ পর্যন্ত সবকিছু নির্ভর করে গল্পের ওপর।

এই জায়গাটিই অপূর্বর ক্যারিয়ারের আরেকটি বৈশিষ্ট্য একটি নির্দিষ্ট জুটির ওপর নির্ভর না করে সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন সহশিল্পীর সঙ্গে নতুন রসায়ন তৈরি করা।
পুরস্কারও এসেছে ক্যারিয়ারের স্বীকৃতি হিসেবে
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি পুরস্কারও পেয়েছেন অপূর্ব। টেলিভিশন অভিনয়ের জন্য এটিএন বাংলা পারফরম্যান্স অ্যাওয়ার্ড, মেরিল-প্রথম আলো দর্শক জরিপ পুরস্কার এবং আরটিভি স্টার অ্যাওয়ার্ডসহ বিভিন্ন স্বীকৃতি তাঁর ঝুলিতে রয়েছে।

তবে পুরস্কারের চেয়েও তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত দর্শকের দীর্ঘস্থায়ী গ্রহণযোগ্যতা। দুই দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের নাটকের দর্শকের কাছে সক্রিয় থাকা এবং একই সঙ্গে নতুন মাধ্যম ও নতুন ধরনের চরিত্রে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া খুব বেশি শিল্পীর পক্ষে সম্ভব হয়নি।
সময়ের সঙ্গে বদলেছে অপূর্বও
অপূর্বর ক্যারিয়ারের শুরুতে দর্শক তাঁকে দেখেছেন তরুণ, রোমান্টিক নায়ক হিসেবে। এরপর এসেছে পারিবারিক গল্প, আবেগনির্ভর চরিত্র, কমেডি, সিরিয়াস চরিত্র এবং ওটিটির থ্রিলারধর্মী কাজ। অর্থাৎ তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য সম্ভবত পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া। ২০২৬ সালেও তাঁর কাজ থেমে নেই। সাম্প্রতিক সময়ে নতুন নাটক ও বিভিন্ন পর্দার কাজে তাঁকে দেখা যাচ্ছে।
তবে পর্দার বাইরের অপূর্বর গল্পটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। মায়ের জন্মদিনে তাঁর সাম্প্রতিক আবেগঘন বার্তায় যে মানুষটিকে দেখা গেল, সেখানে তারকা খ্যাতির চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে সন্তানের কৃতজ্ঞতা। মাকে নিজের জীবনের ‘সেরা উপহার’ বলা সেই অপূর্বই হয়তো ব্যাখ্যা করে দেন দীর্ঘ ক্যারিয়ারে জনপ্রিয়তা, পুরস্কার কিংবা তারকাখ্যাতির বাইরে তাঁর কাছে কিছু সম্পর্ক এখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বেড়ে ওঠা এক তরুণ কীভাবে বাংলাদেশের টেলিভিশনের অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে উঠলেন, তার গল্পটা তাই শুধু একজন অভিনেতার সাফল্যের গল্প নয়। এটি সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নেওয়া, দর্শকের ভালোবাসাকে ধরে রাখা এবং নিজের জায়গা নতুন করে তৈরি করারও গল্প।












