ইউটিউবকে টেক্কা দিতে আসছে বিলিবিলি

UPDATE

বিলিবিলির আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে ব্যবহারকারীদের প্রবেশপ্রক্রিয়ায়। নতুন আন্তর্জাতিক সংস্করণে বিদেশি ব্যবহারকারীদের জন্য আগের মতো পাসপোর্ট বা সরকারি পরিচয়পত্র দিয়ে পরিচয় যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপটি ইতোমধ্যে চালু হয়েছে; পরবর্তী সময়ে আইওএস সংস্করণ এবং আরও দেশে সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটির ক্রিয়েটর-কেন্দ্রিক অ্যাকাউন্ট।

চীনা কনটেন্টের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ভিডিও

বিলিবিলির আন্তর্জাতিক সংস্করণকে শুধু বিদেশিদের জন্য আলাদা একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে না। প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী চীনা ও আন্তর্জাতিক কনটেন্ট একই বৃহৎ কনটেন্ট ইকোসিস্টেমের অংশ হবে। অর্থাৎ একজন আন্তর্জাতিক ব্যবহারকারী চীনের অ্যানিমেশন, গেমিং ও বিনোদনমূলক ভিডিও যেমন দেখতে পারবেন, তেমনি বিশ্বের অন্যান্য দেশের নির্মাতাদের ভিডিওও একই প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাবে।

এই কৌশলের পেছনে বিলিবিলির বড় সম্পদ হলো তাদের বিশাল চীনা দর্শকভিত্তি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির চীনা প্ল্যাটফর্মে মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৩৭ কোটি ৬০ লাখ। ফলে নতুন আন্তর্জাতিক নির্মাতাদের কাছে বিলিবিলির অন্যতম আকর্ষণ হতে পারে শুধু বিদেশি দর্শক নয়, চীনের বিশাল দর্শকবাজারেও পৌঁছানোর সুযোগ।

শুধু অ্যাপ নয়, তৈরি হচ্ছে স্থানীয় টিমও

বিশ্ববাজারে সফল হতে শুধু একটি ইংরেজি অ্যাপ যথেষ্ট নয় বিলিবিলি সেটিও বুঝতে পারছে। তাই যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বাজারে স্থানীয় কর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে লস অ্যাঞ্জেলেস, লন্ডন, মেক্সিকো সিটি, সাও পাওলো, ইস্তাম্বুল ও টোকিওতে কমিউনিটি-সংক্রান্ত পদে নিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক আরেকটি পদে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কনটেন্ট মডারেশন ব্যবস্থার কথাও উঠে এসেছে। এর অর্থ, বিলিবিলির পরিকল্পনা কেবল অ্যাপের অনুবাদ বা নতুন বাজারে প্রবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় দর্শক বোঝা, নির্মাতাদের সঙ্গে যোগাযোগ, কনটেন্ট মডারেশন এবং বাজারভিত্তিক পরিচালন ব্যবস্থা গড়ে তোলাও তাদের পরিকল্পনার অংশ।

নির্মাতাদের জন্য নতুন আয়ের বাজার

বিলিবিলির আন্তর্জাতিক পরিকল্পনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছেন ভিডিও নির্মাতারা। কারণ ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মের সবচেয়ে বড় শক্তি তার কনটেন্ট নয়, বরং কোটি কোটি নির্মাতার তৈরি কনটেন্টের বিশাল অর্থনীতি। বিলিবিলি তাই আন্তর্জাতিক নির্মাতাদের আকৃষ্ট করতে তাদের প্ল্যাটফর্মকে অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ হিসেবেও তুলে ধরছে। নির্মাতা ও ব্র্যান্ডের মধ্যে স্পনসরড কনটেন্টের বাণিজ্যিক যোগাযোগ তৈরির জন্য একটি মার্কেটপ্লেস গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানা গেছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক জনপ্রিয় নির্মাতাদের চীনা প্ল্যাটফর্মে আনার চেষ্টাও আগে থেকেই করছে বিলিবিলি। মার্কিন জনপ্রিয় ইউটিউবার মিস্টারবিস্টের মতো বড় নির্মাতার সঙ্গে তাদের যোগাযোগের বিষয়টিও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে।

 

বিলিবিলির শক্তি কোথায়?

বিলিবিলির বিশেষত্ব শুধু ভিডিও আপলোডের জায়গা হিসেবে নয়। চীনে প্ল্যাটফর্মটি বিশেষ করে অ্যানিমেশন, গেমিং, কমিকস ও তরুণদের বিনোদনকেন্দ্রিক কনটেন্টের জন্য শক্তিশালী কমিউনিটি তৈরি করেছে। দর্শকদের ভিডিও চলার সময় মন্তব্য করার ‘ডানমু’ বা বুলেট-কমেন্ট সংস্কৃতিও বিলিবিলির অন্যতম স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।

আন্তর্জাতিক বাজারেও চীনা অ্যানিমেশন ও বিনোদনমূলক কনটেন্টের চাহিদা বাড়ছে। বিলিবিলির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ তারা ১৭৭টি মৌলিক চীনা অ্যানিমেশন শিরোনাম বিদেশে বিতরণ করেছে; সেগুলো ১৫টি ভাষায় সাবটাইটেল এবং ১১টি ভাষায় ডাবিংয়ের মাধ্যমে দর্শকদের কাছে পৌঁছেছে। অর্থাৎ বিলিবিলির হাতে শুধু প্রযুক্তি নয়, আন্তর্জাতিকভাবে বিক্রি করার মতো নিজস্ব কনটেন্টের ভাণ্ডারও রয়েছে।

তবে ইউটিউবকে হারানো কি এত সহজ?

এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ইউটিউবের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে শুধু ভালো অ্যাপ তৈরি করলেই হবে না। নির্মাতা, দর্শক, বিজ্ঞাপনদাতা ও আয় এই চারটি পক্ষকে একই সঙ্গে প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখতে হবে। বিলিবিলির বড় সুবিধা হলো চীনের বিশাল ব্যবহারকারীভিত্তি ও নিজস্ব কনটেন্ট। কিন্তু ইউটিউবের বৈশ্বিক পরিসর, দীর্ঘদিনের নির্মাতা ইকোসিস্টেম এবং বিজ্ঞাপনভিত্তিক ব্যবসায়িক কাঠামোর সঙ্গে পাল্লা দেওয়া অনেক কঠিন। তাই বিলিবিলির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিদেশি নির্মাতাদের এমন একটি কারণ দেওয়া, যার জন্য তারা ইউটিউবের পাশাপাশি নতুন প্ল্যাটফর্মেও নিয়মিত ভিডিও প্রকাশ করবেন।

সামনে আরও বড় পরীক্ষা তথ্য সুরক্ষা ও নিয়ন্ত্রণে

বিলিবিলির আন্তর্জাতিক যাত্রার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তথ্য সুরক্ষা, কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ ও চীনা মালিকানাধীন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতি পশ্চিমা দেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি। টিকটকের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বিশ্ববাজারে বড় হলে শুধু ব্যবসায়িক সাফল্যই আলোচনায় আসে না; ব্যবহারকারীর তথ্য কোথায় সংরক্ষিত হচ্ছে, কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং কনটেন্ট কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে এসব প্রশ্নও সামনে আসে। বিলিবিলির ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতে একই ধরনের নিয়ন্ত্রক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে বলে প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।

 

বিলিবিলি অবশ্য ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক কনটেন্ট মডারেশনের জন্য এআইভিত্তিক ব্যবস্থা তৈরির কাজ করছে বলে চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে বিশ্ববাজারে বড় হতে হলে বিভিন্ন দেশের আইন, সংস্কৃতি ও কনটেন্ট নীতির সঙ্গে তাদের কতটা সফলভাবে মানিয়ে নিতে পারে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

ইউটিউবের বিকল্প, নাকি নতুন বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বী?

বিলিবিলির এবারের উদ্যোগকে তাই শুধু ‘চীনের আরেকটি ভিডিও অ্যাপের আন্তর্জাতিক সংস্করণ’ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। আন্তর্জাতিক অ্যাপ, সহজ নিবন্ধন, ইংরেজি ওয়েবসাইট, স্থানীয় কর্মী, বিদেশি নির্মাতা এবং ব্র্যান্ড-নির্মাতা সংযোগ সবকিছু মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি একটি পূর্ণাঙ্গ বৈশ্বিক ভিডিও ইকোসিস্টেম তৈরির চেষ্টা করছে। তবে ইউটিউবকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার পথে বিলিবিলির সামনে পথ দীর্ঘ। দর্শক পাওয়া তুলনামূলক সহজ হলেও ভালো নির্মাতাদের দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা, বিজ্ঞাপন ও আয়ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের তথ্য সুরক্ষা ও কনটেন্ট নীতির সঙ্গে মানিয়ে চলাই হবে বড় পরীক্ষা।

তারপরও বিলিবিলির এই পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্ব ভিডিও প্ল্যাটফর্মের বাজার দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি বড় নামের নিয়ন্ত্রণে। সেখানে চীনের বিশাল কনটেন্ট ও দর্শকভিত্তি নিয়ে বিলিবিলি যদি সত্যিই আন্তর্জাতিক নির্মাতাদের টানতে পারে, তাহলে ইউটিউবের একচ্ছত্র আধিপত্যের বাজারে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতার সূচনা হতে পারে। এখন দেখার বিষয় বিলিবিলি কি শুধু চীনের ‘ইউটিউব’ হয়েই থাকবে, নাকি সত্যিই বিশ্বের নতুন ভিডিও জায়ান্ট হয়ে উঠতে পারবে?

You may also like

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *