২০২৬ সালের জুনে ২৮তম সাংহাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের এশিয়ান নিউ ট্যালেন্ট প্রতিযোগিতা বিভাগে ‘দ্য ব্লাইন্ড গার্ল অ্যান্ড অ্যান এলিফ্যান্ট’ সিনেমার জন্য সেরা সিনেমাটোগ্রাফির পুরস্কার পান সামিউল করিম সুপ্তক। বাংলা নাম ‘সাঁকোটা দুলছে’ ইশতিয়াক আহমেদ জিহাদ পরিচালিত সিনেমাটি বাংলাদেশ ও জার্মানির যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত। উৎসবের ২০ জুনের সমাপনী আয়োজনে সুপ্তকের পক্ষে পুরস্কার গ্রহণ করেন পরিচালক ইশতিয়াক আহমেদ জিহাদ ও প্রযোজক মনোজ প্রামাণিক।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই সিনেমার সঙ্গে পথচলা
সুপ্তকের চলচ্চিত্রযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ। সেখানেই তাঁর সঙ্গে পরিচয় ও কাজের সম্পর্ক তৈরি হয় নির্মাতা ইশতিয়াক আহমেদ জিহাদের। দুজনই একই বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন; জিহাদ ছিলেন সুপ্তকের এক ব্যাচ জুনিয়র। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের সেই পরিচয় পরবর্তী সময়ে গড়ে দেয় একটি সৃজনশীল জুটি, যার ফলাফল ‘সাঁকোটা দুলছে’।
তবে সুপ্তকের পরিচয় কেবল একটি চলচ্চিত্রের চিত্রগ্রাহক হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। সিনেমাটোগ্রাফির প্রতি আগ্রহ থেকে ধীরে ধীরে বিভিন্ন স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, নাটক, মিউজিক ভিডিও ও অন্যান্য ভিজ্যুয়াল নির্মাণে কাজ করেছেন তিনি। তাঁর কাজের মধ্যে ‘ছায়া মরিচের বনে’র মতো স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রও রয়েছে, যেখানে তাঁর ক্যামেরার কাজ প্রশংসিত হয়েছে।
প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যেই বড় স্বীকৃতি
‘সাঁকোটা দুলছে’ সুপ্তকের ক্যারিয়ারের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। কিন্তু প্রথম ছবিটিই তাঁর জন্য হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দরজা।

ছবিটির কাজ শুরু হয়েছিল ২০২২ সালের দিকে এবং বিভিন্ন সময়ে শুটিং করে ২০২৩ সালের দিকে তা শেষ হয়। বড় বাজেট কিংবা অত্যাধুনিক সরঞ্জামের সুযোগ ছিল না। ঢাকার বাইরে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে শুটিং করতে গিয়ে নানা ধরনের সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হয়েছে পুরো দলকে। প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব, প্রত্যন্ত লোকেশনে কাজ করা এবং স্থানীয় মানুষের শুটিং সম্পর্কে সীমিত ধারণা সবকিছুর মধ্যেই এগিয়ে নিতে হয়েছে কাজ।
কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতাই শেষ পর্যন্ত তাঁদের থামাতে পারেনি। বরং সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেই নিজেদের ভিজ্যুয়াল ভাবনাকে বাস্তবায়ন করেছেন তাঁরা।
মাত্র একটি ক্যামেরা, একটি লেন্স
‘সাঁকোটা দুলছে’র সিনেমাটোগ্রাফি নিয়ে কথা বলতে গেলে সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয়গুলোর একটি হলো এর নির্মাণের সীমিত উপকরণ। প্রকাশিত সাক্ষাৎকার ও প্রতিবেদনে সুপ্তকের বক্তব্য অনুযায়ী, পুরো সিনেমার শুটিংয়ে ব্যবহার করা হয়েছিল একটি ক্যামেরা এবং একটি ২৪ মিলিমিটার লেন্স। আলাদা কোনো পেশাদার মনিটর কিংবা বড়সড় আলোকসজ্জার ব্যবস্থাও ছিল না।
অর্থাৎ যে ধরনের প্রযুক্তিগত সুবিধা সাধারণত বড় পরিসরের চলচ্চিত্র নির্মাণে দেখা যায়, তার অনেকটাই ছাড়াই একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমার ভিজ্যুয়াল ভাষা তৈরি করতে হয়েছে তাঁকে।
এখানেই সুপ্তকের সিনেমাটোগ্রাফির শক্তিটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতার বদলে গল্প, আলো, কম্পোজিশন এবং পরিবেশকে কাজে লাগিয়েছেন তিনি।
সাদাকালো ফ্রেমে গ্রামীণ বাংলাদেশের গল্প
‘সাঁকোটা দুলছে’র অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য এর সাদাকালো দৃশ্যায়ন। পুরো সিনেমাটিই মনোক্রোমে নির্মিত। গ্রামীণ বাংলাদেশের বাস্তবতায় তিন নারীর জীবন, তাদের বিশ্বাস, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, কুসংস্কার, পিতৃতান্ত্রিক কাঠামো এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে এগিয়েছে সিনেমার গল্প।
সাদাকালো ব্যবহার এখানে শুধু নান্দনিকতার বিষয় নয়; বরং গল্পের আবহ নির্মাণেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আলো ও ছায়ার ব্যবহারের মাধ্যমে চরিত্রগুলোর মানসিক অবস্থা এবং তাদের চারপাশের বাস্তবতাকে আরও তীব্র করে তোলার সুযোগ পেয়েছেন সুপ্তক।
ফলে ছবিটির ভিজ্যুয়াল শুধু গল্পকে অনুসরণ করেনি, বরং গল্প বলার অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

প্রত্যন্ত গ্রামের কঠিন শুটিং
সুপ্তকের নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘সাঁকোটা দুলছে’র শুটিং ছিল সহজ কোনো অভিজ্ঞতা নয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করার কারণে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গেও মানিয়ে নিতে হয়েছে। এমন জায়গায় শুটিং করতে হয়েছে, যেখানে অনেক মানুষের কাছেই চলচ্চিত্রের শুটিং ছিল অপরিচিত বিষয়।
তবে এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেই পুরো দলের মধ্যে তৈরি হয়েছিল শক্তিশালী বন্ধন। সেই বন্ধনই শেষ পর্যন্ত সিনেমাটিকে এগিয়ে নিতে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে জানিয়েছেন সুপ্তক।
পুরস্কারের খবরও পেয়েছেন শুটিং সেটে
সাংহাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার জেতার সময় সুপ্তক চীনে ছিলেন না। তিনি তখন বাংলাদেশে অন্য একটি শুটিংয়ে ব্যস্ত ছিলেন। হোয়াটসঅ্যাপে পুরস্কারের খবর পাওয়ার পর প্রথমে বিষয়টি বিশ্বাসই করতে পারেননি তিনি। পরে দলের অন্য সদস্যরা বিষয়টি নিশ্চিত করলে বুঝতে পারেন, তাঁর ক্যারিয়ারের প্রথম বড় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিটি সত্যিই এসেছে।
আরও মজার বিষয় হলো, এটিই তাঁর নিজের ভাষায় প্রথম টেকনিক্যাল অনার ও বড় অর্জন। অর্থাৎ ক্যামেরার পেছনে দীর্ঘদিনের কাজের পর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রেই এমন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি।

শুধু নিজের নয়, বাংলাদেশেরও অর্জন
সুপ্তকের এই পুরস্কারকে শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ যে চলচ্চিত্রের জন্য তিনি পুরস্কার পেয়েছেন, সেটি বাংলাদেশের গল্প ও বাংলাদেশের বাস্তবতাকে ধারণ করে নির্মিত। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা বিভাগে সেই ছবির সিনেমাটোগ্রাফি স্বীকৃতি পাওয়ার অর্থ হলো বাংলাদেশের একজন তরুণ চলচ্চিত্রকর্মীর কাজ আন্তর্জাতিক জুরিদের নজর কেড়েছে।
সাংহাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র আয়োজনগুলোর একটি। সেই উৎসবের এশিয়ান নিউ ট্যালেন্ট বিভাগে সেরা সিনেমাটোগ্রাফির পুরস্কার পাওয়া তাই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্যও উল্লেখযোগ্য অর্জন।
সীমাবদ্ধতাই হয়ে উঠেছে শক্তি
সুপ্তকের গল্পের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক দিক সম্ভবত এখানেই বিশাল বাজেট, অত্যাধুনিক সরঞ্জাম কিংবা বড় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের শক্তি তাঁর হাতে ছিল না। ছিল একটি ক্যামেরা, একটি লেন্স, সীমিত সরঞ্জাম আর নিজের ভিজ্যুয়াল ভাবনার ওপর আস্থা।
সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই তৈরি হয়েছে এমন একটি সিনেমাটোগ্রাফি, যা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের জুরিদের কাছ থেকে পুরস্কার ছিনিয়ে নিয়েছে।
এ অর্জন তাই শুধু ‘একজন তরুণ চিত্রগ্রাহকের পুরস্কার পাওয়া’র গল্প নয়। এটি প্রমাণ করে, বাংলাদেশের তরুণ চলচ্চিত্রকর্মীদের প্রতিভা ও সৃজনশীলতার ঘাটতি নেই; প্রয়োজন শুধু কাজের সুযোগ, আস্থা এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের তুলে ধরার জায়গা।
সামনে আরও বড় পথ
প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রেই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার পর সুপ্তকের সামনে স্বাভাবিকভাবেই আরও বড় প্রত্যাশা। তবে তাঁর এই অর্জনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তিনি এমন এক সময়ে আন্তর্জাতিক পরিচিতি পেয়েছেন, যখন বাংলাদেশের স্বাধীন ও বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণ নতুন করে বিশ্বের বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে জায়গা করে নিচ্ছে।

ক্যামেরার পেছনে থেকে নিজের কাজ দিয়ে তিনি ইতিমধ্যে একটি বার্তা দিয়েছেন বাংলাদেশের গল্পকে আন্তর্জাতিক মানের ভিজ্যুয়াল ভাষায় বলা সম্ভব। বড় বাজেটের চেয়ে বড় হয়ে উঠতে পারে সৃজনশীলতা; আর সীমাবদ্ধ সরঞ্জামের মধ্যেও তৈরি হতে পারে এমন ছবি, যা বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসবের মঞ্চে সম্মান অর্জন করে।
সামিউল করিম সুপ্তকের সাংহাই-জয় তাই তাঁর ক্যারিয়ারের কেবল শুরু। ক্যামেরার লেন্সে গ্রামীণ বাংলাদেশের আলো-ছায়া ধারণ করে যে তরুণ আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন, তাঁর সামনে এখন আরও অনেক গল্প বলার অপেক্ষা।
আর সেই গল্পগুলোতে বাংলাদেশের কত নতুন মুখ, কত নতুন বাস্তবতা এবং কত অদেখা সৌন্দর্য উঠে আসে সেদিকেই এখন তাকিয়ে থাকবে দেশের চলচ্চিত্রপ্রেমীরা।












