চা শ্রমিকদের শত বছরের বঞ্চনার ইতিহাস গানে তুলে ধরল মেঘদল

Music WorldUPDATE

‘মুল্লুক’ গানটিতে মেঘদলের সঙ্গে কণ্ঠ ও পরিবেশনায় রয়েছেন চা শ্রমিক সম্প্রদায়ের শিল্পী রঞ্জু তাঁতি ও রণজিৎ তাঁতি। গান প্রকাশের পরপরই এর বিষয়বস্তু ও উপস্থাপন নিয়ে শ্রোতাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে আগ্রহ। কারণ, গানটির গল্প শুধু অতীতের কোনো ঘটনা নয়; এর সঙ্গে বর্তমান সময়ের চা শ্রমিকদের জীবনসংগ্রামেরও যোগ রয়েছে।

যে ইতিহাস থেকে ‘মুল্লুক’

গানটির পেছনের ইতিহাস প্রায় এক শতাব্দী আগের। ব্রিটিশ শাসনামলে চা বাগানে কাজের জন্য ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার শ্রমিককে নানা প্রলোভন দেখিয়ে আসাম ও বর্তমান সিলেট অঞ্চলে নিয়ে আসা হয়। ছোটনাগপুর, সাঁওতাল পরগনা, বিহার, ওডিশা, যুক্ত প্রদেশ ও অন্ধ্র প্রদেশসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা এসব শ্রমিককে তিন বছরের চুক্তিতে আনার কথা বলা হলেও অনেকের আর নিজ ঘরে ফেরা হয়নি।

চা বাগানে তাঁদের জীবন ছিল কঠোর পরিশ্রম, অল্প মজুরি এবং নানা বঞ্চনায় ভরা। পরিবার ও জন্মভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অনেকটা বন্দিজীবনের মতো সময় কাটাতে হতো তাঁদের। ধীরে ধীরে শ্রমিকদের মধ্যে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি হয়। ন্যায্য মজুরি ও মুক্ত জীবনের দাবিতে শুরু হয় আন্দোলন।

সেই আন্দোলনই একপর্যায়ে রূপ নেয় ‘মুলুকে চলো’ আন্দোলনে। ১৯২১ সালে চা বাগানের শ্রমিকরা পরিবার-পরিজন নিয়ে নিজেদের ‘মুলুক’ বা জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন। প্রথমে কয়েক শ শ্রমিক যাত্রা শুরু করলেও পরে বিভিন্ন চা বাগান থেকে হাজার হাজার শ্রমিক তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন। একপর্যায়ে এই সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে যায়।

ঘরে ফেরার সেই দীর্ঘ মিছিল

চা বাগান থেকে পায়ে হেঁটে শ্রমিকদের বিশাল দল করিমগঞ্জ রেলস্টেশনে পৌঁছায়। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল রেলপথে চাঁদপুরে গিয়ে সেখান থেকে নদীপথে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়া। কিন্তু চা বাগানের মালিকদের প্রভাবের কারণে তাঁদের জন্য রেলের টিকিট দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়।

ফলে বাধ্য হয়ে অনেক শ্রমিক পায়ে হেঁটেই চাঁদপুরের দিকে যাত্রা করেন। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ১৯২১ সালের মে মাসে হাজার হাজার শ্রমিক চাঁদপুরে পৌঁছান। কিন্তু সেখানেও তাঁদের অপেক্ষায় ছিল ভয়াবহ পরিণতি।

নদীপথে বাড়ি ফেরার চেষ্টা করা শ্রমিকদের ওপর হামলা চালানো হয়। অসহায় নারী, শিশু, বৃদ্ধসহ বহু শ্রমিক মেঘনার জলে পড়ে যান। পরে চাঁদপুর রেলস্টেশনে অবস্থানরত শ্রমিকদের ওপরও সশস্ত্র বাহিনীর হামলার ঘটনা ঘটে। প্রাণ হারান বহু মানুষ। এই নির্মম ঘটনার সঠিক মৃত্যুসংখ্যা আজও স্পষ্ট নয়।

চা শ্রমিকদের ইতিহাসে এই ঘটনা এক গভীর ক্ষত হয়ে আছে। ঘরে ফেরার স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা করা মানুষগুলোর জন্য ‘মুলুক’ হয়ে উঠেছিল একদিকে আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, অন্যদিকে বঞ্চনা ও রক্তক্ষরণের স্মৃতি।

অতীতের সঙ্গে বর্তমানের যোগসূত্র

মেঘদলের ‘মুল্লুক’ শুধু সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনকে স্মরণ করেনি। বরং অতীতের সেই বঞ্চনার সঙ্গে বর্তমান সময়ের চা শ্রমিকদের জীবনসংগ্রামের একটি যোগসূত্র তৈরি করেছে।

আজও চা শ্রমিকদের মজুরি, জীবনমান ও অধিকার নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। সময় বদলেছে, বদলেছে চা বাগানের বাস্তবতা; কিন্তু প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা বৈষম্য ও বঞ্চনার স্মৃতি পুরোপুরি মুছে যায়নি। ‘মুল্লুক’ সেই দীর্ঘ ইতিহাসেরই এক সংগীতভাষ্য।

লোকগানের সুরে ইতিহাসের প্রতিধ্বনি

গানটির অন্যতম বিশেষত্ব এর সংগীত নির্মাণে। ‘মুল্লুক’-এ ব্যবহার করা হয়েছে চা শ্রমিকদের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা লোকগান ‘পিঞ্জরাকে পুষুল ময়না’। জংলি ভাষার এই গানটি শ্রীমঙ্গলের একটি চা বাগান থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। গানটি সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন শিল্পী মৌসুমী ভৌমিক।

লোকগানের সেই সুরের সঙ্গে মেঘদল যুক্ত করেছে চা শ্রমিকদের দীর্ঘ বঞ্চনা ও সংগ্রামের ইতিহাস। ফলে ‘মুল্লুক’ হয়ে উঠেছে আধুনিক ব্যান্ডসংগীত ও লোকঐতিহ্যের এক ভিন্নধর্মী সংমিশ্রণ।

গানটির কথা ও সুর করেছেন মেঘদলের ভোকাল শিবু কুমার শীল। সংগীতায়োজন করেছে মেঘদল। মিক্স ও মাস্টারিং করেছেন রাশীদ শরীফ শোয়েব ও আমজাদ হোসেন।

‘মুল্লুক’ নিয়ে শিবু কুমার শীল

গানটির ভাবনা প্রসঙ্গে শিবু কুমার শীলের বক্তব্যেও উঠে এসেছে চা শ্রমিকদের দীর্ঘ যন্ত্রণার কথা। তাঁর মতে, চা বাগানের শ্রমিকরা একেকজন সেই বঞ্চনার উত্তরাধিকার বহন করছেন, যার শিকড় ঔপনিবেশিক সময় পর্যন্ত বিস্তৃত।

১৯২১ সালের ‘মুলুকে চলো’ আন্দোলন থেকে বর্তমান সময়ের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন—এই দীর্ঘ ধারাবাহিকতার মধ্যেই তিনি চা শ্রমিকদের সংগ্রামকে দেখেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘মুল্লুক’ মূলত সেই বঞ্চিত মানুষদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি।

এই গানের সূত্র ধরে মেঘদল চা শ্রমিকদের লোকগান ও ইতিহাসের অনুসন্ধানেও ফিরে গেছে। শ্রীমঙ্গলের রাজঘাট চা বাগানে গিয়ে সংগ্রহ করা হয়েছে তাঁদের কণ্ঠে বয়ে চলা পুরোনো সুর। সেই সুরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রক্ত, শ্রম আর চায়ের ইতিহাস।

শুধু গান নয়, একটি স্মরণ

‘মুল্লুক’ তাই কেবল একটি নতুন গান নয়। এটি এমন এক জনগোষ্ঠীর ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা, যাদের শ্রমে শত বছর ধরে দেশের চা শিল্প গড়ে উঠেছে।

যে মানুষগুলো একদিন হাজার মাইল দূরের মুলুকে ফেরার স্বপ্নে রওনা হয়েছিল, তাঁদের সেই আকাঙ্ক্ষা, বেদনা ও সংগ্রামই নতুন করে ফিরে এসেছে মেঘদলের গানে। ইতিহাসের সেই প্রশ্নও যেন থেকে যায় মানুষ কি কোনোদিন সত্যিই তার কাঙ্ক্ষিত মুলুকে ফিরে যেতে পারে?

‘মুল্লুক’-এর ভিডিও নির্দেশনা দিয়েছেন কৃষ্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায়। ভিডিওতে মেঘদলের সদস্যদের পাশাপাশি অংশ নিয়েছেন রঞ্জু তাঁতি ও রণজিৎ তাঁতি। তাঁদের উপস্থিতি গানটির গল্পকে আরও বাস্তব ও গভীর করে তুলেছে।

You may also like

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *