জহির রায়হানের দুই ঐতিহাসিক সিনেমাই নেই আর্কাইভে!

FilmsUPDATE

জহির রায়হানের ৯১তম জন্মবার্ষিকীতে সামনে এসেছে এই আক্ষেপের তথ্য। বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের সংগ্রহে নেই তাঁর নির্মিত উর্দু চলচ্চিত্র ‘সংগম’ ও ‘বাহানা’। শুধু তাই নয়, কলিম শরাফীর সঙ্গে যৌথভাবে নির্মিত ‘সোনার কাজল’-এর কোনো প্রিন্টও আর্কাইভের সংগ্রহে পাওয়া যায়নি।

১৯৬৪ সালে মুক্তি পাওয়া ‘সংগম’ ছিল তৎকালীন পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র। এর পরের বছর ১৯৬৫ সালে মুক্তি পায় ‘বাহানা’, যা ছিল পাকিস্তানের প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র। অর্থাৎ প্রযুক্তি ও নির্মাণশৈলীর দিক থেকে ছবি দুটি শুধু জহির রায়হানের ক্যারিয়ারেই গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, তৎকালীন পাকিস্তানি চলচ্চিত্রের ইতিহাসেও ছিল মাইলফলক।

‘সংগম’ নির্মাণের সময় জহির রায়হান এমন এক সময়ের চলচ্চিত্রাঙ্গনে কাজ করছিলেন, যখন পূর্ব পাকিস্তানের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য নতুন প্রযুক্তি ও বড় পরিসরের নির্মাণ ছিল বেশ কঠিন। সেই বাস্তবতায় রঙিন উর্দু চলচ্চিত্র নির্মাণ করে তিনি নিজের নির্মাণদক্ষতার আলাদা পরিচয় দেন। ছবিটি মুক্তির পর দর্শকদের কাছেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

 

এরপর ‘বাহানা’য় তিনি ব্যবহার করেন সিনেমাস্কোপ প্রযুক্তি। ফলে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে জহির রায়হানের নির্মাণযাত্রায় যুক্ত হয় দুটি ঐতিহাসিক অর্জন—একটি রঙিন চলচ্চিত্র এবং একটি সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই দুই গুরুত্বপূর্ণ কাজের সংরক্ষণ নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় শূন্যতা।

১৯৭৮ সালে চলচ্চিত্র সংগ্রহ ও সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ। বর্তমানে সেখানে ১০ হাজারের বেশি চলচ্চিত্র সংরক্ষিত রয়েছে। জহির রায়হানের বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রও প্রতিষ্ঠানটির সংগ্রহে আছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘কখনো আসেনি’, ‘বেহুলা’, ‘কাঁচের দেয়াল’, ‘আনোয়ারা’, ‘মনের মতো বউ’ এর আংশিক অংশ, ‘জীবন থেকে নেয়া’ এবং ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ এর আংশিক অংশ।

তবে ‘সংগম’ ও ‘বাহানা’র ক্ষেত্রে গল্পটা ভিন্ন।

ফিল্ম আর্কাইভের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান বা স্বত্বাধিকারী ছবি জমা দিলে সেটি ডিজিটাল রূপে সংরক্ষণ করা হয়। কিন্তু অনেক পুরোনো চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে স্বত্বাধিকারীরা প্রিন্ট জমা দেননি। আবার কিছু চলচ্চিত্রের মূল প্রিন্ট সময়ের সঙ্গে নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

ফিল্ম আর্কাইভের সাবেক কর্মকর্তা ফখরুল আলম জানিয়েছেন, ‘সংগম’ ও ‘বাহানা’ খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত সেগুলোর কোনো প্রিন্ট পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, মূল প্রিন্ট নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণেই হয়তো ছবি দুটি আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

 

তবে ‘সংগম’ নিয়ে পুরোপুরি হতাশ হওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই। বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভে না থাকলেও চলচ্চিত্র গবেষক মীর শামছুল আলমের ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছবিটির একটি ডিজিটালাইজড কপি থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। অর্থাৎ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কার মধ্যেও অন্তত ‘সংগম’-এর একটি সংস্করণ ব্যক্তিগত সংগ্রহে টিকে আছে।

কিন্তু ‘বাহানা’র ক্ষেত্রে এখনো কোনো সুখবর নেই। গবেষক বা ব্যক্তিগত সংগ্রাহকদের কাছেও ছবিটির কোনো কপি পাওয়া গেছে এমন তথ্য এখন পর্যন্ত সামনে আসেনি। ফলে জহির রায়হানের এই ঐতিহাসিক সিনেমাটি কার্যত দুর্লভ এক চলচ্চিত্র-নিদর্শনে পরিণত হয়েছে।

আর ‘সোনার কাজল’-এর ঘটনাটিও কম আক্ষেপের নয়। ১৯৬২ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটি জহির রায়হান ও কলিম শরাফীর যৌথ পরিচালনায় নির্মিত হয়েছিল। এটি জহির রায়হানের চলচ্চিত্রজীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ হলেও বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভে এর কোনো প্রিন্ট পাওয়া যায়নি।

একজন নির্মাতার সৃষ্টিকর্ম শুধু তাঁর সময়ের গল্প বলে না; একটি দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসও ধারণ করে। বিশেষ করে জহির রায়হানের মতো নির্মাতার চলচ্চিত্রগুলো বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ দলিল। তাই তাঁর নির্মিত ছবি হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি সিনেমা হারানো নয়, হারিয়ে যাওয়া একটি সময়ের দৃশ্যমান স্মৃতিও।

‘সংগম’-এর একটি ডিজিটাল কপি ব্যক্তিগত সংগ্রহে টিকে থাকার খবর তাই আশার আলো দেখায়। এখন প্রশ্ন, ‘বাহানা’ কিংবা ‘সোনার কাজল’-এর কোনো কপি কি দেশের বাইরে, কোনো ব্যক্তিগত সংগ্রহে অথবা পুরোনো কোনো ফিল্ম আর্কাইভে এখনো রয়ে গেছে?

হয়তো কোনো একদিন সেই অনুসন্ধানেরও উত্তর মিলবে। আর যদি না মেলে, তাহলে জহির রায়হানের এই চলচ্চিত্রগুলো বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসে এমন কিছু অধ্যায় হয়ে থাকবে, যেগুলোর কথা সবাই জানে কিন্তু পর্দায় ফিরে দেখার সুযোগ আর নেই।

You may also like

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *