দুর্গাপূজার আনন্দে নতুন পোশাকের আকর্ষণ ছোটদের কাছে বরাবরই আলাদা। অঞ্জলি দেওয়া, পরিবারের সঙ্গে মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানো কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে উৎসব উপভোগ করা, সব আয়োজনেই চাই পছন্দের পোশাক। তাই মেয়েশিশুদের সাজে এবার দেখা যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী নকশার সঙ্গে আধুনিক ফ্যাশনের মেলবন্ধন। ফ্রক, লেহেঙ্গা, ঘাগরা, সালোয়ার-কামিজ থেকে শুরু করে ছোটদের উপযোগী রেডি শাড়ি, পছন্দের তালিকায় রয়েছে নানা ধরনের পোশাক।
ফ্রক ও আঙরাখা কাটের পোশাকে নতুনত্ব
শিশুদের পোশাকে এখন শুধু চেনা নকশা নয়, কাটছাঁটেও থাকছে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। রঙ বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৌমিক দাসের ভাষ্য অনুযায়ী, এবারের সংগ্রহে নেপালি উড কার্ভিংয়ের নকশা ও দুর্গার প্রতীকী অবয়ব থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক নকশার ফোলানো হাতার ফ্রক, আঙরাখা কাটের কামিজ ও পেপলাম কামিজও রয়েছে।
এ ধরনের পোশাকে উৎসবের ঐতিহ্য বজায় রাখার পাশাপাশি শিশুর সাজে যোগ হয় সমসাময়িক ফ্যাশনের ছোঁয়া। বিশেষ করে রঙিন নকশা, সুন্দর হাতা ও পোশাকের কাট ছোটদের সাজকে করে তুলতে পারে আরও আকর্ষণীয়।
ছোটদের জন্য লেহেঙ্গা, স্কার্ট ও আরামদায়ক টি-শার্ট
নবজাতক থেকে দুই বছর বয়সী শিশুদের পোশাক নির্বাচনে সুবিধা ও আরামকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন শিশু পরিবহনের সহপ্রতিষ্ঠাতা ডিজাইনার ফায়েকা জাবীন সিদ্দিকা। তাঁর মতে, এই বয়সী শিশুদের জন্য সামনে খোলা ফ্রক বেশ সুবিধাজনক। এতে পোশাক পরানো ও খোলার ঝামেলা কম হয়।
দুই থেকে সাত বছর বয়সী মেয়েদের জন্য জামদানি বা খাদি কাপড়ের লেহেঙ্গা ও সালোয়ার-কামিজও হতে পারে ভালো পছন্দ। তবে পূজার মণ্ডপে ছোটাছুটি কিংবা দীর্ঘ সময় বাইরে থাকার পরিকল্পনা থাকলে পোশাকের নকশার পাশাপাশি চলাফেরার সুবিধাও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
বক্স প্লিটেড স্কার্ট বা হারেম প্যান্টের সঙ্গে বাংলা টাইপোগ্রাফির স্ক্রিনপ্রিন্ট করা সুতির টি-শার্টও হতে পারে ভিন্নধর্মী সাজ। এতে ঐতিহ্যবাহী উৎসবের আবহের সঙ্গে যুক্ত হবে আধুনিক ও স্বচ্ছন্দ ফ্যাশন।
বড়দের মতো শাড়ি পরার শখ ছোটদেরও
পূজায় অনেক মেয়েশিশুই মায়ের মতো শাড়ি পরতে চায়। কিন্তু ছোটদের জন্য সাধারণ শাড়ি সামলে চলাফেরা করা কঠিন হতে পারে। এ সমস্যার সমাধান হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছে কুঁচি ও আঁচল আগে থেকেই সেলাই করা রেডি শাড়ি।
হ্যালো বিউটিফুল বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বারাতি জাহানের মতে, এ ধরনের শাড়িতে শিশুদের শখ পূরণের পাশাপাশি চলাফেরার সুবিধাও থাকে। উৎসবের কোনো একটি দিনে মা ও মেয়ে একই রং কিংবা কাছাকাছি নকশার পোশাক পরেও সাজতে পারেন। মা-মেয়ের এমন সমন্বিত সাজ ছবিতেও তৈরি করবে সুন্দর মুহূর্ত।
এ ছাড়া বেশি ঘের দেওয়া স্কার্ট ও ঘাগরাও মেয়েশিশুদের উৎসবের সাজে মানানসই। রঙিন স্কার্টের সঙ্গে সাধারণ টপ কিংবা নকশা করা কামিজ মিলিয়ে তৈরি করা যায় বৈচিত্র্যময় লুক।
গরমে সুতি, সন্ধ্যায় হালকা জমকালো কাপড়
শরতের আবহাওয়ায় দিনের বেলায় গরম ও আর্দ্রতা অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। তাই শিশুদের পূজার পোশাক নির্বাচনে কাপড়ের বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ফায়েকা জাবীন সিদ্দিকার পরামর্শ অনুযায়ী, দিনের বেলায় ঘোরাঘুরির জন্য জ্যাকার্ড কটন, স্লাব কটন, ভিসকস কিংবা সাধারণ সুতি কাপড় বেছে নেওয়া যেতে পারে। এসব কাপড়ে তৈরি পোশাক তুলনামূলক স্বচ্ছন্দ এবং দীর্ঘ সময় পরার উপযোগী।
অন্যদিকে সন্ধ্যার প্রতিমা দর্শন কিংবা বিশেষ কোনো অনুষ্ঠানের জন্য সুতির সঙ্গে হালকা সিল্ক, জর্জেট বা অরগাঞ্জার ব্যবহার পোশাকে আনতে পারে উৎসবের আমেজ। তবে কাপড়ের সৌন্দর্যের পাশাপাশি সেটি শিশুর ত্বকে আরামদায়ক কি না, সেটিও খেয়াল রাখা দরকার।
লাল-সাদার বাইরে যেসব রং নজর কাড়ছে
দুর্গাপূজার সাজে লাল, সাদা, মেরুন, ম্যাজেন্টা, হলুদ ও সোনালি রঙের আবেদন চিরকালীন। তবে এবার পরিচিত রঙের পাশাপাশি ভিন্ন রঙের সমন্বয়েও আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
বারাতি জাহানের মতে, অফ হোয়াইটের সঙ্গে মেরুন কিংবা বেগুনি আভাযুক্ত বাঙ্গি রঙের সঙ্গে মেরুনের বৈপরীত্য শিশুদের পোশাকে আলাদা মাত্রা যোগ করতে পারে। গোলাপি ও কমলার প্যাস্টেল শেডও হতে পারে কোমল ও স্নিগ্ধ সাজের উপযোগী পছন্দ।
এ ছাড়া আকাশি, নীল ও সবুজের মতো রং ছোটদের পোশাকে এনে দিতে পারে সতেজতা। পোশাকের রং বাছাইয়ের সময় শিশুর পছন্দকেও গুরুত্ব দেওয়া ভালো। একই সঙ্গে পোশাকের নকশা ও রঙের সঙ্গে মানানসই ছোট চুলের ক্লিপ, হালকা গয়না কিংবা আরামদায়ক জুতা সাজ সম্পূর্ণ করতে পারে।
বাজেটের মধ্যে পূজার কেনাকাটা
শিশুদের পোশাক কেনার সময় নকশা ও কাপড়ের পাশাপাশি বাজেটও গুরুত্বপূর্ণ। প্রকাশিত বাজারতথ্য অনুযায়ী, সাধারণ সুতি ফ্রক ও আরামদায়ক টি-শার্ট তুলনামূলক সাশ্রয়ী দামে পাওয়া যায়। রেডি শাড়ির জন্য আনুমানিক ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা বাজেট রাখা যেতে পারে। সালোয়ার-কামিজের দাম শুরু হয় প্রায় ১ হাজার টাকা থেকে। আর খাদি বা জামদানি কাপড়ের লেহেঙ্গা কিংবা বিশেষ নকশার পোশাকের দাম শুরু হতে পারে ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে। দোকান, কাপড়, নকশা ও আকারভেদে দাম কমবেশি হতে পারে।
পূজার পাঁচ দিনের জন্য একাধিক পোশাক কিনতে চাইলে আগে থেকেই কেনাকাটার পরিকল্পনা করা ভালো। দিনের বেলায় আরামদায়ক পোশাক এবং সন্ধ্যার জন্য একটু জমকালো সাজ বেছে নিলে একই সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্য ও বৈচিত্র্য বজায় রাখা সম্ভব।
সবশেষে, ছোটদের পূজার সাজে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পোশাকটি যেন তাদের চলাফেরা ও আনন্দ উপভোগে বাধা না দেয়। সুন্দর নকশা, মানানসই রং ও আরামদায়ক কাপড়ের সমন্বয়েই পূজার প্রতিটি দিন হয়ে উঠতে পারে আরও আনন্দময়।












