অসুস্থ ইলিয়াস কাঞ্চন, সুচন্দা-চম্পার আড্ডায় ফিরে এলেন সোনালি দিনের নায়ক

DhallywoodUPDATE

দীর্ঘ ১৫ মাসেরও বেশি সময় যুক্তরাজ্যে চিকিৎসাধীন থাকার পর স্বল্প সময়ের জন্য দেশে ফিরেছেন চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। দেশে ফেরার পর শনিবার রাতে গুলশানের বাসায় তাঁকে দেখতে যান বরেণ্য অভিনয়শিল্পী সুচন্দা ও তাঁর ছোট বোন চম্পা। দীর্ঘদিন পর কাছের সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা হওয়ায় সেই রাতের আড্ডায় ফিরে আসে ঢাকাই চলচ্চিত্রের সোনালি সময়ের নানা স্মৃতি। পুরোনো দিনের গল্পের পাশাপাশি ইলিয়াস কাঞ্চন গানও শোনান তাঁদের। চম্পা তাঁর জন্য নিয়ে যান জমজমের পানি ও একটি পাঞ্জাবি।

অসুস্থতার কঠিন সময়েও প্রিয় সহকর্মীদের সঙ্গে এমন আন্তরিক মুহূর্তে ইলিয়াস কাঞ্চনের মুখে হাসি যেন তাঁর দীর্ঘ চলচ্চিত্রজীবনেরই আরেকটি ছবি। কারণ এই মানুষটির জীবন কেবল রুপালি পর্দায় নায়ক হয়ে ওঠার গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একের পর এক সংগ্রাম, ব্যক্তিগত শোক, সামাজিক আন্দোলন এবং মানুষের জন্য লড়াইয়ের দীর্ঘ ইতিহাস।

ইদ্রিস আলী থেকে ইলিয়াস কাঞ্চন

ইলিয়াস কাঞ্চনের প্রকৃত নাম ইদ্রিস আলী। ১৯৫৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার আশুতিয়াপাড়া গ্রামে জন্ম তাঁর। কবি নজরুল সরকারি কলেজ থেকে ১৯৭৫ সালে এইচএসসি পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। কৈশোর থেকেই অভিনয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। মঞ্চনাটকের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। সেই মঞ্চই শেষ পর্যন্ত তাঁকে নিয়ে যায় চলচ্চিত্রের দরজায়।

সুভাষ দত্তের নজরে পড়েন মঞ্চে অভিনয় করতে গিয়ে। এরপর ১৯৭৭ সালে সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘বসুন্ধরা’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড়পর্দায় অভিষেক ঘটে তাঁর। বিপরীতে ছিলেন তখনকার জনপ্রিয় অভিনেত্রী ববিতা। প্রথম সিনেমাতেই এমন একজন কিংবদন্তি নির্মাতা ও জনপ্রিয় অভিনেত্রীর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ ইলিয়াস কাঞ্চনের ক্যারিয়ারকে শুরুতেই আলাদা পরিচিতি দেয়।

ধীরে ধীরে নায়ক থেকে সুপারস্টার

‘বসুন্ধরা’র পর আর পেছনে তাকাতে হয়নি ইলিয়াস কাঞ্চনকে। ‘ডুমুরের ফুল’, ‘সুন্দরী’, ‘শেষ উত্তর’, ‘আঁখি মিলন’, ‘অভিযান’, ‘মোহনা’, ‘পরিণীতা’, ‘ভেজা চোখ’সহ একের পর এক চলচ্চিত্রে অভিনয় করে নিজের জায়গা শক্ত করেন তিনি। আশির দশকে তাঁর জনপ্রিয়তা আরও বাড়তে থাকে।

১৯৮৬ সালে আলমগীর কবিরের ‘পরিণীতা’ তাঁর ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক এনে দেয়। এই চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি।

তবে ইলিয়াস কাঞ্চনের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় সম্ভবত ১৯৮৯ সালের ‘বেদের মেয়ে জোছনা’। অঞ্জু ঘোষের সঙ্গে জুটি বেঁধে অভিনয় করা এই চলচ্চিত্র তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। ছবিটির ব্যবসায়িক সাফল্য দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে।

চম্পা, দিতি ও অঞ্জুর সঙ্গে জনপ্রিয় জুটি

ইলিয়াস কাঞ্চনের চলচ্চিত্রজীবনের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য তাঁর বিভিন্ন নায়িকার সঙ্গে সফল জুটি। বিশেষ করে চম্পা, দিতি ও অঞ্জু ঘোষের সঙ্গে তাঁর জুটি দর্শকদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল।

তথ্যভিত্তিক চলচ্চিত্র-ডেটাবেজের হিসাবে, দিতির সঙ্গে তিনি প্রায় ৪২টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। চম্পার সঙ্গে তাঁর কাজের সংখ্যাও ছিল উল্লেখযোগ্য—প্রায় ৩১টি চলচ্চিত্র। চম্পার চলচ্চিত্রে অভিষেকও হয়েছিল ইলিয়াস কাঞ্চনের সঙ্গে ‘তিন কন্যা’ ছবিতে।

তাই শনিবার রাতে চম্পার ইলিয়াস কাঞ্চনের বাসায় যাওয়া শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়; এর ভেতরে লুকিয়ে আছে কয়েক দশকের সহকর্মীসুলভ সম্পর্ক এবং একসঙ্গে অসংখ্য চলচ্চিত্রে কাজ করার স্মৃতি।

শুধু অভিনেতা নন, প্রযোজক-পরিচালকও

ইলিয়াস কাঞ্চনের পরিচয় শুধু নায়কেই সীমাবদ্ধ নয়। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি চলচ্চিত্র প্রযোজনা ও পরিচালনাতেও যুক্ত ছিলেন। ‘জয় চলচ্চিত্র’ নামে তাঁর প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ছিল। ‘মাটির কসম’ দিয়ে প্রযোজনায় যাত্রা শুরু করে পরবর্তী সময়ে ‘বদসুরত’, ‘মুন্না মাস্তান’, ‘বাঁচার লড়াই’, ‘বাদশা ভাই’ ও ‘শেষ রক্ষা’র মতো চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেন। পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। তাঁর পরিচালিত চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘বাবা আমার বাবা’ ও ‘মায়ের স্বপ্ন’। অর্থাৎ অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্র নির্মাণের অন্য ক্ষেত্রগুলোতেও নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছিলেন এই অভিনেতা।

 

ব্যক্তিজীবনের যে ঘটনা বদলে দিল তাঁর জীবন

ইলিয়াস কাঞ্চনের জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় আসে ১৯৯৩ সালে। ওই বছরের ২২ অক্টোবর সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান তাঁর স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চন। এই দুর্ঘটনা শুধু একজন স্বামী ও বাবাকে শোকাহত করেনি; পরবর্তী সময়ে এটি বদলে দেয় ইলিয়াস কাঞ্চনের জীবনের গতিপথও।

স্ত্রীর মৃত্যুর পর একসময় অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন তিনি। কিন্তু পরে নিজের ব্যক্তিগত শোককে মানুষের নিরাপত্তার জন্য কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৯৩ সালের ১ ডিসেম্বর এফডিসি থেকে জাতীয় প্রেসক্লাব পর্যন্ত পদযাত্রার মধ্য দিয়ে শুরু হয় ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের কার্যক্রম।

পর্দার নায়ক থেকে বাস্তবের আন্দোলনকর্মী

‘নিরাপদ সড়ক চাই’ ধীরে ধীরে একটি বড় সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হয়। সড়ক দুর্ঘটনা কমানো, চালক ও পথচারীদের সচেতন করা এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন ইলিয়াস কাঞ্চন।

এই সামাজিক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি। ২০১৮ সালে সমাজসেবায় অবদানের জন্য তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।

চলচ্চিত্রের পর্দায় তিনি ছিলেন নায়ক; কিন্তু ব্যক্তিজীবনের এই অধ্যায়ের পর অনেকের কাছে তাঁর আরেকটি পরিচয় তৈরি হয়—সড়ক নিরাপত্তার জন্য লড়াই করা একজন সামাজিক আন্দোলনের মুখ হিসেবে।

এবার জীবনের সবচেয়ে কঠিন লড়াই

এত দীর্ঘ কর্মময় জীবনের পর এখন ইলিয়াস কাঞ্চনকে লড়তে হচ্ছে নিজের শারীরিক অসুস্থতার সঙ্গে।

২০২৫ সালের শুরুতে তাঁর কথা বলতে সমস্যা ও স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা দেখা দেয়। ৯ এপ্রিল ঢাকার একটি হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাঁর মস্তিষ্কে টিউমার শনাক্ত হয়। বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞরা টিউমারটির অবস্থান জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় চিকিৎসার জন্য তাঁকে যুক্তরাজ্যে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ২৬ এপ্রিল তিনি লন্ডনের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন।

লন্ডনে হার্লি স্ট্রিট ক্লিনিকে দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট উইলিংটন হাসপাতালে তাঁর মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করা হয়। চিকিৎসকেরা জানিয়েছিলেন, টিউমারটি মস্তিষ্কের গভীরে গুরুত্বপূর্ণ নার্ভের সংযোগস্থলের কাছে থাকায় পুরোটা অপসারণ করা ঝুঁকিপূর্ণ। পুরো টিউমার সরাতে গেলে জীবনহানি কিংবা চলনশক্তি ও কথা বলার ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কা ছিল। তাই অস্ত্রোপচারে টিউমারের একটি অংশ অপসারণ করা হয় এবং বাকি অংশের জন্য পরবর্তী চিকিৎসা চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

অস্ত্রোপচারের পর শুরু হয় দীর্ঘ চিকিৎসা। রেডিয়েশন ও কেমোথেরাপি তথা টার্গেটেড থেরাপির মাধ্যমে অবশিষ্ট টিউমার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। পরবর্তী সময়ে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ধাপও চলতে থাকে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে তাঁর পরিবারের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, তিন মাসের প্রথম ধাপের চিকিৎসার পর তিনি দ্বিতীয় ধাপের ওরাল থেরাপিও নিচ্ছিলেন।

চিকিৎসার মধ্যেও পরিবারের সান্নিধ্য

দীর্ঘ চিকিৎসার কারণে কর্মব্যস্ত জীবন থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। লন্ডনে মেয়ের পরিবারের সঙ্গে থাকছেন তিনি। চিকিৎসার পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানোই এখন তাঁর জীবনের বড় অংশ। সাম্প্রতিক চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে তাঁর শারীরিক অবস্থার খুব বড় উন্নতি না হলেও চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, টিউমার শরীরের অন্য কোথাও ছড়িয়ে পড়েনি—যা ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এরপর দীর্ঘ ১৫ মাসেরও বেশি সময় যুক্তরাজ্যে চিকিৎসাধীন থাকার পর স্বল্প সময়ের জন্য দেশে ফিরেছেন তিনি। আর দেশে ফিরেই প্রিয় সহকর্মী ও বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করছেন। সেই ধারাবাহিকতায় সুচন্দা ও চম্পার সঙ্গে শনিবার রাতের আড্ডা হয়ে উঠেছে বিশেষ এক মুহূর্ত।

সেই মানুষটির কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রার্থনা

ইলিয়াস কাঞ্চনের জীবনকে যদি এক বাক্যে বলতে হয়, তাহলে হয়তো বলা যায়—এটি এক নায়কের পর্দা থেকে বাস্তব জীবনের সংগ্রামে উঠে আসার গল্প।

১৯৭৭ সালে ‘বসুন্ধরা’ দিয়ে যে তরুণ অভিনেতার যাত্রা শুরু, তিনি পরবর্তী সময়ে হয়ে উঠেছেন জনপ্রিয় নায়ক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী অভিনেতা, প্রযোজক ও পরিচালক। ‘বেদের মেয়ে জোছনা’র মতো ঐতিহাসিক সাফল্যের অংশ হয়েছেন। আবার ব্যক্তিগত জীবনের ভয়াবহ শোককে শক্তিতে পরিণত করে গড়ে তুলেছেন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন। সেই কাজের স্বীকৃতিতে পেয়েছেন একুশে পদক।

আজ জীবনের আরেক কঠিন অধ্যায়ে দাঁড়িয়ে সেই ইলিয়াস কাঞ্চন। একদিকে দীর্ঘ চিকিৎসা, অন্যদিকে প্রিয়জনদের ভালোবাসা। আর এই সময়েই সুচন্দা-চম্পার মতো দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা যখন তাঁর পাশে গিয়ে বসেন, পুরোনো দিনের গল্প করেন, আর ইলিয়াস কাঞ্চন গান শোনান—তখন মনে হয়, অসুস্থতা তাঁর শরীরকে ক্লান্ত করতে পারে, কিন্তু চলচ্চিত্রের মানুষটির ভেতরের সেই শিল্পীসত্তাকে এখনো নিভিয়ে দিতে পারেনি।

রুপালি পর্দায় তিনি বহুবার লড়েছেন, জিতেছেন, দর্শকের ভালোবাসা পেয়েছেন। বাস্তব জীবনেও এবার চলছে তাঁর সবচেয়ে বড় লড়াই। এই লড়াইয়ে ইলিয়াস কাঞ্চনের জন্য এখন তাঁর অগণিত দর্শক, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীর একটাই চাওয়া—প্রিয় নায়ক আবার সুস্থ হয়ে ফিরুন নিজের পরিচিত জীবনে।

You may also like

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *