একটি ক্যামেরা, একটি স্কুটার আর নিজের অনুভূতির সঙ্গে মিলে যাওয়া কিছু লোকেশন—বড় বাজেট কিংবা তারকাবহুল আয়োজন নয়, বরং নিজস্ব শিল্পভাবনা থেকেই তৈরি হয়েছে যুবরাজ শামীমের দ্বিতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘অতল’। এবার সেই ভিন্নধর্মী নির্মাণভাষা জায়গা করে নিয়েছে রাশিয়ার মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে।
বাংলাদেশের স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা যুবরাজ শামীমের ‘অতল’ বা ‘ইন বিটুইন লিভিং’ নির্বাচিত হয়েছে রাশিয়ার ১৯তম ‘ইস্ট অ্যান্ড ওয়েস্ট: ক্ল্যাসিকস অ্যান্ড অ্যাভান্ট–গার্ড আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’-এর মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে। আগামী ২১ থেকে ২৭ আগস্ট রাশিয়ার ঐতিহাসিক শহর ওরেনবুর্গে অনুষ্ঠিত হবে উৎসবটি।

এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সিনেমাটির যাত্রা শুরু হয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিলে ৪৮তম মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ারের মধ্য দিয়ে দর্শকের সামনে আসে ‘অতল’। সেখানে সিনেমাটি ‘অ্যাপোক্যালিপস নাও’ প্রতিযোগিতা বিভাগে প্রদর্শিত হয় এবং নেটপ্যাক অ্যাওয়ার্ডের জন্যও প্রতিযোগিতা করে।
তবে ‘অতল’-এর এবারের অর্জন শুধু একটি আন্তর্জাতিক উৎসবের প্রতিযোগিতা বিভাগে জায়গা করে নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। উৎসব কর্তৃপক্ষ নির্মাতা যুবরাজ শামীমকে স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণ ও তাঁর নিজস্ব চলচ্চিত্র দর্শন নিয়ে দুটি মাস্টারক্লাস পরিচালনার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
এই মাস্টারক্লাসে স্বাধীনভাবে সিনেমা নির্মাণের অভিজ্ঞতা, সীমিত সম্পদে কাজ করার বাস্তবতা এবং নিজের চলচ্চিত্রভাষা নিয়ে কথা বলবেন শামীম। ফলে ‘অতল’ প্রদর্শনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে বাংলাদেশের স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন তিনি।

‘অতল’ নির্মিত হয়েছে দরবার শরীফের ব্যানারে। নির্মাতার কাছে এটি প্রচলিত অর্থে শুধু একটি সিনেমা নয়; বরং এক ধরনের ‘ভিজ্যুয়াল পেইন্টিং’। সিনেমাটির চিত্রনাট্য, পরিচালনা, প্রযোজনা ও সম্পাদনার দায়িত্বে আছেন যুবরাজ শামীম। প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি সিনেমাটির চিত্রগ্রহণেও যুক্ত ছিলেন নাঈম তুষার।
সিনেমাটির নির্মাণপ্রক্রিয়াটিও ছিল বেশ আলাদা। বড় বাজেট, পরিচিত তারকা কিংবা প্রচলিত বাণিজ্যিক কাঠামোর বদলে নিজেদের অনুভূতি ও শিল্পভাবনাকে গুরুত্ব দিয়েছেন নির্মাতা। শামীম ও নাঈম তুষার একটি ক্যামেরা নিয়ে স্কুটারে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন। যে লোকেশন তাদের অনুভূতির সঙ্গে মিলে গেছে, সেটিই হয়ে উঠেছে সিনেমার দৃশ্যপট।
এই নির্মাণপদ্ধতিই ‘অতল’-কে প্রচলিত চলচ্চিত্রের চেয়ে আলাদা করে তুলেছে। এখানে বাজেটের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে নির্মাতার চোখ, অনুভূতি এবং কাব্যিক নির্মাণপ্রক্রিয়া। ফলে সিনেমাটি যেন গল্প বলার পাশাপাশি একটি নির্দিষ্ট ভিজ্যুয়াল অনুভূতিও তৈরি করতে চেয়েছে।
কারিগরি দলেও রয়েছেন স্বাধীন চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত একদল নির্মাতা ও শিল্পী। শব্দগ্রহণের দায়িত্বে রিপন নাথ, কালার গ্রেডিংয়ে আবদুল্লাহ রাকিব এবং পোস্টার ডিজাইনে কাজ করেছেন শিবু কুমার শীল।

যুবরাজ শামীমের আন্তর্জাতিক যাত্রায় ‘অতল’ অবশ্য একেবারে নতুন অধ্যায় নয়। তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘আদিম’ ২০২২ সালে ৪৪তম মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে অংশ নিয়েছিল। সেখান থেকে সিনেমাটি জিতে নেয় স্পেশাল জুরি অ্যাওয়ার্ড ও নেটপ্যাক জুরি অ্যাওয়ার্ড। ফলে চার বছরের ব্যবধানে আবারও মস্কো ও রাশিয়ার চলচ্চিত্র উৎসবের পরিসরে শামীমের নতুন সিনেমার উপস্থিতি তাঁর নির্মাণভাবনার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাকেই সামনে নিয়ে আসে।
‘আদিম’-এর পর ‘অতল’-এও তিনি অনুসরণ করেছেন নিজের পথ। তারকা কিংবা বড় বাজেটের ওপর নির্ভর না করে নিজস্ব চলচ্চিত্রভাষা তৈরির চেষ্টা করেছেন। আর সেই স্বাধীন নির্মাণভাবনাই এবার জায়গা করে নিয়েছে রাশিয়ার আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক মঞ্চে।
সিনেমাটির প্রদর্শনীতে অংশ নিতে আগামী ১৯ আগস্ট রাশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বেন যুবরাজ শামীম। সেখানে ‘অতল’-এর প্রদর্শনী ছাড়াও দুটি মাস্টারক্লাসে অংশ নেবেন তিনি।
বাংলাদেশের স্বাধীন চলচ্চিত্রের জন্যও এই যাত্রা তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মঞ্চে ‘অতল’ শুধু একটি সিনেমা হিসেবে যাচ্ছে না; সঙ্গে যাচ্ছে সীমিত সম্পদে, প্রচলিত বাণিজ্যিক কাঠামোর বাইরে দাঁড়িয়ে নিজের শিল্পভাবনা দিয়ে সিনেমা বানানোর এক বাংলাদেশি নির্মাতার গল্প।
মস্কো থেকে ওরেনবুর্গ—‘অতল’-এর এই যাত্রা তাই কেবল একটি সিনেমার উৎসব সফর নয়; বরং নিজের মতো করে সিনেমা বানানোর স্বপ্নকে আন্তর্জাতিক পর্দায় পৌঁছে দেওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।












