ভ্রমণের গল্প থেকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির মঞ্চে সালাহউদ্দীন সুমন

UPDATE
একজন ভ্রমণপ্রেমী মানুষের কাছে পৃথিবী মানেই শুধু পরিচিত পর্যটনকেন্দ্র নয়। অজানা পথ, হারিয়ে যেতে বসা ইতিহাস, প্রত্যন্ত জনপদ কিংবা সাধারণ মানুষের জীবনও হতে পারে গল্পের উপকরণ। সালাহউদ্দীন সুমনের কনটেন্টের বড় বৈশিষ্ট্য এখানেই। তিনি ভ্রমণকে শুধু দৃশ্য দেখানোর জায়গায় আটকে রাখেননি, বরং এর সঙ্গে যুক্ত করেছেন ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবন।
৩ অক্টোবর ঢাকার শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তার হাতে তুলে দেওয়া হয় ‘বাংলাদেশ পর্যটন পুরস্কার ২০২৬’। বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের আয়োজনে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোগকে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সরকারি ও বেসরকারি অংশীজনের সমন্বয়ে গঠিত জুরি বোর্ডের যাচাই-বাছাইয়ের পর নির্বাচিত হন বিজয়ীরা।

সাংবাদিকতা থেকে কনটেন্ট ক্রিয়েশনে

সালাহউদ্দীন সুমনের গল্পটা অবশ্য শুরু হয়েছিল অন্য জায়গা থেকে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা পড়ার সময়ই সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি। পরে পত্রিকা ও বেসরকারি টেলিভিশনে কাজ করেন। ২০১৩ সালে ঢাকায় এসে টেলিভিশন সাংবাদিকতায় দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেন। ২০২১ সাল পর্যন্ত সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি।
সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতাই পরে তাকে কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রে আলাদা সুবিধা দিয়েছে। স্ক্রিপ্ট লেখা, ক্যামেরা, ভয়েসওভার কিংবা ভিডিও সম্পাদনা, কাজের প্রয়োজনেই এসব দক্ষতা তৈরি হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েই ধীরে ধীরে ইউটিউবের জগতে প্রবেশ করেন তিনি।
তবে শুরুটা ছিল পরিকল্পিত। কেবল ভিডিও বানানোর জন্য ভিডিও বানাননি। কোন ধরনের বিষয় দর্শকের আগ্রহ তৈরি করে, কোন বিষয় নিয়ে তুলনামূলক কম কাজ হয়েছে, এসব নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। সেখান থেকেই ইতিহাস ও ভ্রমণকে একসঙ্গে তুলে ধরার ভাবনা আসে।

একটি ভিডিও বদলে দিল পথ

সালাহউদ্দীন সুমনের কনটেন্ট ক্যারিয়ারে বড় বাঁক আসে মুর্শিদাবাদকে ঘিরে তৈরি একটি ভিডিওতে। মীর জাফরের বংশধরদের খুঁজে বের করে তাদের গল্প তুলে ধরেছিলেন তিনি। সেই ভিডিও দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। এক ভিডিওতেই তার ইউটিউব চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবার প্রায় ৭০ হাজার বেড়ে যায়।
এরপর বাড়তে থাকে দর্শক, পরিচিতি ও আয়। একপর্যায়ে ইউটিউব থেকে তার আয় চাকরির বেতনের চেয়েও বেশি হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত নিয়মিত চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি কনটেন্ট ক্রিয়েশনে মনোনিবেশ করেন তিনি। ২০২২ সালের মাঝামাঝি থেকে এটিই হয়ে ওঠে তার প্রধান কাজ।
বর্তমানে তার ইউটিউব চ্যানেলে ৩৩ লাখের বেশি সাবস্ক্রাইবার এবং ফেসবুকে ৪৯ লাখের বেশি অনুসারী রয়েছে। তার একাধিক ভিডিও মিলিয়ন ভিউ পেয়েছে, এমনকি একটি ভিডিও এক কোটিরও বেশি বার দেখা হয়েছে।

অ্যান্টার্কটিকা থেকে আর্কটিক, ক্যামেরায় বিশ্ব

বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়েও সুমনের ভ্রমণকাহিনি পৌঁছেছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। অ্যান্টার্কটিকা, আর্কটিক ও আমাজনের মতো দুর্গম অঞ্চলেও ক্যামেরা নিয়ে হাজির হয়েছেন তিনি। ২০২৬ সালের শুরুতে অ্যান্টার্কটিকা অভিযানের পর একই বছর আর্কটিক অঞ্চলেও অভিযানে যান তিনি।
তবে বিশ্বভ্রমণের ঝলক থাকলেও তার কনটেন্টে বাংলাদেশের জায়গাটা আলাদা। দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, পুরোনো স্থাপনা, অচেনা ভূপ্রকৃতি, লোকজ সংস্কৃতি থেকে প্রত্যন্ত গ্রামের জীবন, সবই উঠে এসেছে তার ভিডিওতে।
রাজশাহীর পদ্মাতীরের চরখানপুর গ্রাম তার বিশেষ পছন্দের জায়গাগুলোর একটি। তিন দিক দিয়ে ভারতের সীমান্তঘেঁষা এই গ্রামের ঋতুভেদে বদলে যাওয়া রূপ তাকে টানে। নিজের চ্যানেলে গ্রামটি নিয়ে একাধিক ভিডিওও তৈরি করেছেন তিনি।

পর্যটন মানেই শুধু কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন নয়

রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়ার পর নিজের ভাবনার কথাও স্পষ্ট করেছেন সুমন। তার মতে, বাংলাদেশের পর্যটনের প্রচার এখনো কয়েকটি পরিচিত গন্তব্যকে ঘিরেই বেশি। কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন বা সাজেকের বাইরে দেশের গ্রামবাংলার বিপুল সম্ভাবনাকে সামনে আনা দরকার।
তার দৃষ্টিতে, বাংলাদেশের গ্রাম শুধু মানুষের বসতি নয়, এটি একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা। ঋতু বদলের সঙ্গে বদলে যায় প্রকৃতি, মানুষের জীবনযাপন ও চারপাশের দৃশ্য। সঠিক পরিকল্পনা ও প্রচারের মাধ্যমে এই বৈচিত্র্য আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
এখানেই হয়তো সুমনের কনটেন্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি ধরা পড়ে। তিনি শুধু কোথাও গিয়ে সৌন্দর্যের ছবি দেখান না, সেই জায়গার পেছনের গল্পটাও খুঁজে বের করেন।

পুরস্কার, তবে থামার নয়

নিজের প্রথম রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়াকে বিশেষ অর্জন হিসেবে দেখছেন সালাহউদ্দীন সুমন। তার ভাষায়, দেশের পর্যটনের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের কাছ থেকে এমন সম্মাননা পাওয়া একজন ক্রিয়েটরের জন্য আনন্দ ও গর্বের। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, পর্যটন খাত নিয়ে প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতেও সমালোচনা করবেন, কারণ তার উদ্দেশ্য দেশের পর্যটনের উন্নয়ন। এই অবস্থানটাই হয়তো তার গল্পকে আরও আলাদা করে। পুরস্কারটি তার কাজের স্বীকৃতি, কিন্তু তার কাছে ভ্রমণের গল্প বলার কাজটি আরও বড়।
আগামী দিনে কনটেন্ট ক্রিয়েশনের পাশাপাশি তথ্যচিত্র ও ডকুমেন্টারি তৈরির জন্য ‘কথাচিত্র কমিউনিকেশন’ নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে তার। নতুনদের প্রশিক্ষণ দিতে ‘সালাহউদ্দীন সুমন একাডেমি’ গড়ার ভাবনাও আছে।
একসময় সংবাদকক্ষ থেকে শুরু হয়েছিল যে পথচলা, সেটি আজ পৌঁছেছে অ্যান্টার্কটিকার বরফ থেকে বাংলার প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত। আর ‘বর্ষসেরা ট্যুরিজম কনটেন্ট ক্রিয়েটর’ পুরস্কার সেই দীর্ঘ যাত্রায় যোগ করল একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অধ্যায়।
সালাহউদ্দীন সুমনের গল্প তাই কেবল একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরের পুরস্কার পাওয়ার গল্প নয়। এটি গল্প বলার ধরন বদলে ফেলার, অচেনাকে পরিচিত করে তোলার এবং বাংলাদেশের পর্যটনকে নতুন চোখে দেখার এক চলমান যাত্রা।

You may also like

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *