দাবিটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লেও এর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভারতীয় ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান নিউজচেকারের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঘটনাটির পক্ষে নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমাণ নেই। বরং ভাইরাল হওয়া ছবিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
কী দাবি ছড়িয়েছে?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টগুলোতে বলা হয়েছে, নানা পাটেকারের নাতির জন্মের পর মহারাষ্ট্রের একটি মাদরাসা থেকে একজন শিক্ষককে ডেকে আনা হয়। এরপর ওই শিক্ষক নবজাতকের কানে আজান শোনান।
পোস্টে আরও দাবি করা হয়, আজানের অর্থ ও অনুবাদ জানার পর নানা পাটেকার এতে গভীরভাবে প্রভাবিত হন। সেই কারণেই নাতির জীবনের শুরুতে তাকে আজান শোনানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। একই সঙ্গে মাদরাসার ১২০ জনের বেশি শিক্ষার্থীকে নতুন পোশাক দেওয়া এবং খাবারের আয়োজন করার কথাও বলা হয়েছে।
এমনকি কথিত এই ঘটনার সমালোচনার জবাবে নানা পাটেকার নিজের জীবন নিজের মতো করে পরিচালনা করার কথা বলেছেন এমন বক্তব্যও ভাইরাল পোস্টে যুক্ত করা হয়েছে। তবে এসব দাবির কোনো নির্ভরযোগ্য মূল উৎস সেখানে উল্লেখ করা হয়নি।
অনুসন্ধানে কী পাওয়া গেল?
নিউজচেকার প্রথমে নানা পাটেকারের পারিবারিক তথ্য যাচাই করে। StarsUnfolded, FilmiBeat ও IMDb-সহ বিভিন্ন উৎসে তাঁর পরিবার সম্পর্কে যে তথ্য পাওয়া যায়, সেখানে ছেলে মালহার পাটেকারের উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু নাতি বা নাতনির জন্মের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নানা পাটেকারের কোনো কন্যাসন্তান থাকার তথ্যও পাওয়া যায়নি। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ‘নাতি’ বা ‘নাতনি’র জন্মের গল্প ছড়ানো হয়েছে, সেটির ভিত্তিই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
শুধু পারিবারিক তথ্য নয়, ভাইরাল ছবিগুলোর সত্যতাও যাচাই করা হয়েছে। রিভার্স ইমেজ সার্চে ছবিগুলোর সঙ্গে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করার মতো কোনো নির্ভরযোগ্য উৎস পাওয়া যায়নি। বরং ছবিগুলো বিশ্লেষণ করে একাধিক এআই শনাক্তকারী ব্যবস্থায় কৃত্রিমভাবে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা পাওয়া গেছে।
Newschecker-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, Sightengine ছবিগুলো এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার ৯৯ শতাংশ সম্ভাবনা দেখিয়েছে। Hive Moderation-এর বিশ্লেষণেও এআই বা ডিপফেক হওয়ার সম্ভাবনা ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ দেখানো হয়েছে। পাশাপাশি অন্য কয়েকটি এআই শনাক্তকারী ব্যবস্থার ফলও একই দিকে ইঙ্গিত করেছে। ছবিতে থাকা একটি সিন্থআইডি ওয়াটারমার্কও সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে।
তাহলে ছবিগুলো এল কোথা থেকে?
ফ্যাক্টচেকাররা পুরোনো সংবাদমাধ্যমের ছবির সঙ্গেও ভাইরাল ছবির মিল খুঁজে দেখেছেন। অনুসন্ধানে নানা পাটেকারের এমন একটি পুরোনো ছবি পাওয়া যায়, যেখানে তাঁর পোশাক ও চশমার সঙ্গে ভাইরাল ছবির কিছু মিল রয়েছে। অর্থাৎ পুরোনো বাস্তব ছবিকে ব্যবহার করে সেটির ওপর এআইয়ের মাধ্যমে নতুন দৃশ্য তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে।
এ ধরনের ভুয়া দাবির সঙ্গে ব্যবহৃত ছবির কারণে গল্পটি আরও বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছে। কিন্তু কোনো নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম, নানা পাটেকার নিজে কিংবা তাঁর প্রতিনিধির কাছ থেকে কথিত ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করার মতো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
‘আজান পছন্দ করেন’ এই দাবির সঙ্গে কি কোনো বাস্তব ঘটনা মিশে গেছে?
ভাইরাল পোস্টের কিছু সংস্করণে নানা পাটেকারের আজানের প্রতি প্রশংসার কথাও বলা হয়েছে। তবে সেটিকে নাতির কানে আজান শোনানোর ঘটনার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। একটি বিষয়ে কারও ব্যক্তিগত মত বা কোনো পুরোনো বক্তব্য থাকলেও, তা থেকে পরবর্তী একটি নির্দিষ্ট ঘটনা সত্য বলে ধরে নেওয়া যায় না।
এদিকে কিছু ওয়েবসাইট এই গল্পটি ‘reported’ বা ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে প্রকাশ করেছে। কিন্তু এসব প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট কোনো ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের নাম, ঘটনার তারিখ, মাদরাসার পরিচয়, শিক্ষকের নাম কিংবা নানা পাটেকারের সরাসরি বক্তব্য দেওয়া হয়নি। ফলে সেসব প্রতিবেদনও স্বাধীনভাবে দাবিটির সত্যতা প্রমাণ করে না।
সত্যটা কী?
এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নানা পাটেকার নাতির কানে আজান শুনিয়েছেন, মাদরাসার ১২০ জনের বেশি শিক্ষার্থীকে নতুন পোশাক ও খাবার দিয়েছেন কিংবা এ নিয়ে কোনো বক্তব্য দিয়েছেন এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
বরং ফ্যাক্টচেক অনুসন্ধানে ভাইরাল ছবিগুলো এআই-নির্মিত হওয়ার শক্ত প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং নানা পাটেকারের পরিবারে কথিত নাতি বা নাতনির জন্মের দাবিরও নির্ভরযোগ্য ভিত্তি পাওয়া যায়নি। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গল্পটিকে সত্য ঘটনা হিসেবে প্রচার করার সুযোগ নেই।
ঘটনাটি আবারও দেখিয়ে দিচ্ছে, কোনো পরিচিত তারকাকে ঘিরে আবেগঘন গল্পের সঙ্গে ছবি থাকলেই সেটিকে সত্য ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে এআই দিয়ে তৈরি বা পরিবর্তিত ছবি এখন খুব সহজেই বাস্তব ঘটনার মতো করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে।












