‘মায়ার জঞ্জাল’ নির্মাণ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের পরিচালক ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী। ‘ফড়িং’, ‘একটি বাঙালি ভূতের গপ্পো’ ও ‘ভালোবাসার শহর’-এর মতো কাজ দিয়ে পরিচিত এই নির্মাতা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুটি ছোটগল্প ‘বিষাক্ত প্রেম’ ও ‘সুবালা’ অবলম্বনে সিনেমাটির গল্প নির্মাণ করেছেন। বাংলাদেশের প্রযোজক হিসেবে আছেন জসীম আহমেদ।
দীর্ঘ বিরতির পর কেন আবার সিনেমায় ফিরেছিলেন অপি করিম এ নিয়েও আগে কথা বলেছেন এই অভিনেত্রী। পড়াশোনা ও পরবর্তী সময়ে পেশাগত ব্যস্ততার কারণে নিয়মিত চলচ্চিত্রে কাজ করা হয়ে ওঠেনি তাঁর। তবে ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরীর আগের কাজগুলো অপির ভালো লেগেছিল। বিশেষ করে ‘ভালোবাসার শহর’ সিনেমায় জয়া আহসানের অভিনয় তাঁকে নতুন করে চলচ্চিত্রে কাজ করার আগ্রহ তৈরি করেছিল। সেই আগ্রহের সঙ্গে অভিনেতা ঋত্বিক চক্রবর্তীর যুক্ত হওয়া এবং সিনেমাটির স্বাভাবিক গল্প-চরিত্রও তাঁকে কাজটিতে আগ্রহী করে তোলে।

‘মায়ার জঞ্জাল’-এ অপি করিম অভিনয় করেছেন সোমা চরিত্রে। তাঁর স্বামীর চরিত্র ‘চন্দন’ বা ‘চাঁদু’তে দেখা গেছে কলকাতার অভিনেতা ঋত্বিক চক্রবর্তীকে। তাঁদের পাশাপাশি সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন সোহেল মন্ডল, পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ব্রাত্য বসু, চান্দ্রেয়ী ঘোষসহ দুই বাংলার আরও কয়েকজন অভিনয়শিল্পী।
সিনেমাটিতে পাশাপাশি এগিয়েছে দুটি গল্প। সমাজের প্রান্তিক বাস্তবতায় থাকা সোমা ও চন্দনের জীবনের নানা সংকটের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে টিকে থাকার সংগ্রাম। সম্পর্কের টানাপোড়েন, অর্থনৈতিক চাপ, হতাশা এবং প্রতিদিনের বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা সবকিছু মিলিয়ে মানুষের জীবনের এক কঠিন চিত্র তুলে ধরেছেন নির্মাতা।

চন্দন চরিত্রটি নিয়ে ঋত্বিক চক্রবর্তী বলেছিলেন, এই চরিত্রটি প্রচলিত সিনেমার পরিচিত কোনো ছকে তৈরি নয়। বরং চরিত্রটির সামাজিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সংকট এবং মানসিক টানাপোড়েনকে গল্পে বিস্তারিতভাবে দেখানো হয়েছে। ফলে চরিত্রটির মধ্য দিয়ে সমাজের একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের জীবনসংগ্রামও সামনে আসে।
সোহেল মন্ডলের জন্যও ‘মায়ার জঞ্জাল’ ছিল ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। সিনেমায় তাঁর চরিত্রের নাম সত্য। অভিনয়ের জন্য নবাগত অভিনেতা হিসেবে ফিল্মফেয়ার বাংলা পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি। দীর্ঘ সময় পর সিনেমাটি আবার দর্শকদের সামনে আসায় উচ্ছ্বসিত এই অভিনেতা। বিশেষ করে যারা এতদিন সিনেমাটি দেখার অপেক্ষায় ছিলেন, এবার ওটিটির মাধ্যমে তাঁদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নগরজীবনের কঠিন বাস্তবতাই ‘মায়ার জঞ্জাল’-এর গল্পের মূল পটভূমি। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক, নৈতিক সংকট ও জীবনে টিকে থাকার লড়াই এই বিষয়গুলোর মধ্য দিয়ে এগিয়েছে সিনেমার কাহিনি। বিভিন্ন চরিত্রের জীবন একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সামনে এসেছে ভালোবাসা, হতাশা, সামাজিক বৈষম্য এবং কঠিন সিদ্ধান্তের গল্প।
প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির আগেই অবশ্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যাত্রা শুরু করেছিল ‘মায়ার জঞ্জাল’। ২০২০ সালে সাংহাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সিনেমাটির প্রিমিয়ার হয় এবং এশিয়ান নিউ ট্যালেন্ট বিভাগে মনোনয়ন পায়। একই বছর মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও নির্বাচিত হয় সিনেমাটি।
পরবর্তী সময়ে ইতালির এশিয়াটিকা চলচ্চিত্র উৎসবে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগে জুরি পুরস্কার এবং কলকাতার আর্টহাউস এশিয়া চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা দক্ষিণ এশীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের পুরস্কার অর্জন করে সিনেমাটি। ২০২২ সালে ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের এশিয়ান ফিল্ম কম্পিটিশন বিভাগে সেরা চিত্রনাট্যের পুরস্কারও পায়।

এরপর ২০২৪ সালের ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডস বাংলায় সিনেমাটি সাতটি পুরস্কার অর্জন করে। দুই বাংলার প্রেক্ষাগৃহে ‘মায়ার জঞ্জাল’ মুক্তি পেয়েছিল ২০২৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি।
প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির কয়েক বছর পর এবার ওটিটি দর্শকদের সামনে আসছে সিনেমাটি। ফলে অপি করিমের ১৯ বছর পরের চলচ্চিত্রযাত্রা এবার আরও বড় পরিসরে নতুন দর্শকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পাচ্ছে।












