কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভিন্ন টুলে একটি ছবি আপলোড করে সঙ্গে কয়েকটি নির্দেশনা দিলেই বর্তমানের চেহারাকে কয়েক দশক আগের লুকে বদলে দেওয়া যাচ্ছে। কয়েক মুহূর্তেই তৈরি হচ্ছে এমন ছবি, যা দেখে মনে হতে পারে সেটি আশির দশকের কোনো পুরোনো অ্যালবাম থেকে উঠে এসেছে। নস্টালজিয়ার এই ট্রেন্ড নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। কিন্তু এর সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও জড়িয়ে আছে এআই টুলে ছবি দেওয়ার সময় আমরা আসলে শুধু একটি ছবি দিচ্ছি, নাকি নিজের সম্পর্কে আরও অনেক তথ্যও তুলে দিচ্ছি?
আপনার মুখের ছবিও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
মানুষের কাছে একটি ছবি হয়তো শুধুই ছবি। কিন্তু প্রযুক্তির কাছে একটি মুখের ছবি একজন ব্যক্তিকে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হতে পারে।
বিশেষ করে একই ব্যক্তির একাধিক ছবি যখন কোনো এআই সেবায় আপলোড করা হয়, তখন বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সামনে থেকে তোলা ছবি, পাশ থেকে তোলা ছবি, ভিন্ন বয়সের ছবি কিংবা ভিন্ন পরিবেশের ছবি সব মিলিয়ে একজন ব্যক্তির চেহারা সম্পর্কে অনেক বেশি তথ্য তৈরি হতে পারে।
একটি ছবি পছন্দ হয়নি, তাই আরেকটি ছবি দিলেন। চুলের ধরন বদলাতে আরও একটি ছবি, পোশাক বদলাতে আরেকটি। কখনো আবার নিজের সঙ্গে বন্ধু, সঙ্গী কিংবা পরিবারের সদস্যদের ছবিও যুক্ত হচ্ছে। এভাবে মজার একটি ট্রেন্ডে অংশ নিতে গিয়ে অজান্তেই অনেক বেশি ব্যক্তিগত তথ্য একটি ডিজিটাল সেবার কাছে চলে যেতে পারে।
ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডও অনেক কিছু বলে
এআইয়ে ছবি দেওয়ার সময় শুধু নিজের মুখের দিকে তাকালেই হবে না। ছবির পুরো ফ্রেমটিও খেয়াল করা দরকার।
কারণ পেছনের দৃশ্য থেকেই প্রকাশ হয়ে যেতে পারে বাড়ি বা অফিসের পরিচয়, ঘরের নম্বর, গাড়ির নম্বর, স্কুলের পোশাক, রাস্তার সাইনবোর্ড, কোনো নথি কিংবা কর্মস্থলের তথ্য। ছবিতে থাকা শিশুর মুখ বা পরিবারের অন্য সদস্যের উপস্থিতিও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে ছবির সঙ্গে থাকা অতিরিক্ত ফাইল-সংক্রান্ত তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাই এআই টুলে ছবি আপলোড করার আগে একবার পুরো ছবিটি ভালোভাবে দেখে নেওয়া জরুরি।
আর ছবিতে যদি অন্য কেউ থাকেন, তাঁর সম্মতির বিষয়টিও মাথায় রাখা উচিত। নিজের ছবি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আপনার থাকলেও ছবিতে থাকা অন্য ব্যক্তির ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য।
ছবি ডিলিট করলেই কি তথ্য মুছে যায়?
এআই সেবায় ছবি দেওয়ার ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তথ্য কত দিন সংরক্ষণ করা হচ্ছে। কোনো সেবায় ছবি বা কথোপকথন আপলোড করার আগে তাদের গোপনীয়তা নীতি দেখে নেওয়া ভালো। তথ্য কত দিন রাখা হয়, কী কাজে ব্যবহার করা হতে পারে, ব্যবহারকারী চাইলে তা মুছে ফেলতে পারেন কি না এসব বিষয় পরিষ্কারভাবে জানা দরকার।
চ্যাটজিপিটির ক্ষেত্রে সাধারণ কথোপকথন ব্যবহারকারী মুছে না ফেলা পর্যন্ত অ্যাকাউন্টে থাকতে পারে। মুছে ফেলার পর স্থায়ীভাবে অপসারণের প্রক্রিয়া সাধারণত ৩০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও নিরাপত্তা, প্রতারণা প্রতিরোধ বা আইনি প্রয়োজনের মতো কিছু ব্যতিক্রম থাকতে পারে।
তাই কোনো ছবি আপলোডের আগে শুধু ‘ছবিটি কীভাবে ব্যবহার করা হবে’ নয়, ‘কত দিন রাখা হবে’ এই প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ।
ঝুঁকি শুধু তথ্য সংরক্ষণে নয়
এআইভিত্তিক ছবি ও ভিডিও ব্যবহারের ক্ষেত্রে গোপনীয়তার ঝুঁকি এখন আর কেবল তাত্ত্বিক বিষয় নয়। বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের সেবার নিরাপত্তা দুর্বলতার কারণে ব্যবহারকারীদের দেওয়া কনটেন্ট অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে প্রকাশ পাওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে।
তাই প্রশ্ন শুধু এই নয় যে কোনো প্রতিষ্ঠান আপনার ছবি কীভাবে ব্যবহার করবে। যে সার্ভারে ছবিটি সংরক্ষিত হচ্ছে, সেটি কতটা নিরাপদ সেটিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
এর পাশাপাশি রয়েছে ছবির অপব্যবহারের আশঙ্কা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি সংগ্রহ করে অনুমতি ছাড়া বিকৃত করা কিংবা ভুয়া কনটেন্ট তৈরির ঘটনাও বাড়ছে। বাংলাদেশেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ভুয়া বা অশ্লীল ছবি তৈরির মাধ্যমে হয়রানি ও অর্থ আদায়ের অভিযোগে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে।
অর্থাৎ আপনি যে ছবিটি নিছক মজা করে আশির দশকের লুকে তৈরি করছেন, সেটি আপনার কাছে হয়তো একটি সাধারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট। কিন্তু সেটি অন্য কারও হাতে গেলে ব্যবহারের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে।
প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদল দরকার আইনেও
ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশেও আলোচনা বাড়ছে। ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এ ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে সম্মতি এবং ব্যক্তির তথ্যের ওপর অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে নতুন ধরনের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। ছবি বিকৃত করে হয়রানি, ভুয়া ছবি তৈরি কিংবা ব্যক্তিগত ছবি ব্যবহার করে প্রতারণার মতো বিষয়গুলো নিয়ে আইন ও নীতিমালার আরও স্পষ্টতা প্রয়োজন।
প্রযুক্তি যেভাবে দ্রুত বদলাচ্ছে, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা নিয়ে সচেতনতা এবং নীতিমালাকেও একই গতিতে এগিয়ে নিতে হবে।
এআইয়ে ছবি দেওয়ার আগে যা মনে রাখবেন
আশির দশকের লুক কিংবা অন্য কোনো জনপ্রিয় ট্রেন্ডে এআই দিয়ে ছবি বানাতে পারেন। তবে কয়েকটি অভ্যাস আপনাকে অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি থেকে দূরে রাখতে পারে।
ব্যক্তিগত ছবি বেছে নিন সচেতনভাবে
অত্যন্ত ব্যক্তিগত, অন্তরঙ্গ বা সংবেদনশীল ছবি এআই টুলে আপলোড না করাই ভালো। এমন ছবি বেছে নিন, যেটি অনলাইনে ছড়িয়ে পড়লেও বড় ধরনের সমস্যার আশঙ্কা কম।
ছবির পেছনের দৃশ্য পরীক্ষা করুন
বাড়ির নম্বর, পরিচয়পত্র, অফিসের নথি, গাড়ির নম্বর, স্কুলের পরিচয় কিংবা রাস্তার সাইনবোর্ডের মতো তথ্য দৃশ্যমান আছে কি না দেখে নিন।
অন্যের ছবি ব্যবহারে অনুমতি নিন
বন্ধু, সঙ্গী, পরিবারের সদস্য কিংবা শিশুর ছবি এআই টুলে দেওয়ার আগে তাঁদের সম্মতি নেওয়া উচিত।
একই ব্যক্তির অনেক ছবি একসঙ্গে দেবেন না
একটি ট্রেন্ডে অংশ নেওয়ার জন্য একই ব্যক্তির বিভিন্ন বয়স, কোণ ও পরিবেশের অসংখ্য ছবি আপলোড করার প্রয়োজন আছে কি না, ভেবে দেখুন।
গোপনীয়তা নীতি পড়ে নিন
যে এআই সেবা ব্যবহার করছেন, সেটি আপনার ছবি কীভাবে ব্যবহার করে, কত দিন সংরক্ষণ করে এবং মুছে ফেলার সুযোগ দেয় কি না এসব তথ্য আগে জেনে নিন।
তথ্য ব্যবহারের নিয়ন্ত্রণ দেখুন
কোনো সেবায় তথ্য মডেল উন্নয়ন বা অন্য কাজে ব্যবহারের বিষয়ে নিয়ন্ত্রণের সুযোগ থাকলে সেটি নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারণ করুন।
কাজ শেষে মুছে ফেলার সুযোগ থাকলে ব্যবহার করুন
ছবি বা কথোপকথন আর প্রয়োজন না থাকলে ডিলিট করার ব্যবস্থা থাকলে সেটি ব্যবহার করুন। তবে ডিলিট করলেই সব কপি সঙ্গে সঙ্গে মুছে গেছে এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
পোস্ট করার আগে আবার ভাবুন
এআই দিয়ে তৈরি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের পর অন্যরা সেটি কপি, সংরক্ষণ কিংবা পুনরায় ব্যবহার করতে পারে। তাই ভবিষ্যতেও ছবিটি অনলাইনে থাকলে আপনি স্বস্তিতে থাকবেন কি না, একবার ভেবে নিন।
এআইকে কখনোই পুরোপুরি ব্যক্তিগত জায়গা ভাববেন না
সবচেয়ে সহজ নিয়মটি মনে রাখা যায় এভাবে এআই টুলে এমন কোনো ছবি বা তথ্য দেওয়া উচিত নয়, যা অন্য কারও হাতে চলে গেলে আপনি অস্বস্তিতে পড়তে পারেন।
আশির দশকের নস্টালজিয়া উপভোগ করুন, নিজের পছন্দের লুক তৈরি করুন, ট্রেন্ডে অংশ নিন। তবে ‘আপলোড’ বাটনে চাপ দেওয়ার আগে কয়েক সেকেন্ড থামুন। সেই ছোট্ট বিরতিটিই হয়তো আপনার ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস হয়ে উঠতে পারে।












