একটি গান কিংবা নাটক প্রকাশের পর দীর্ঘ সময় ধরে সেটি থেকে আয় হতে পারে। অথচ অনেক শিল্পী ও স্রষ্টার সঙ্গে কাজের শুরুতেই এককালীন পারিশ্রমিকের চুক্তি করা হয়। ফলে পরবর্তীতে কনটেন্টটি থেকে বিপুল পরিমাণ আয় হলেও সেখানে স্রষ্টার অংশ থাকবে কি না, তা অনেক ক্ষেত্রেই নির্ভর করে চুক্তির শর্তের ওপর।
বাংলাদেশের কপিরাইট আইনে গান, সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্র, রেকর্ডিং ও সম্প্রচারসহ বিভিন্ন সৃজনশীল কাজ সুরক্ষিত। কপিরাইট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক না হলেও মালিকানা নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে তা গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করতে পারে।
গানের ক্ষেত্রে সংকট সবচেয়ে বেশি
ডিজিটাল দুনিয়ায় রয়্যালটির বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে সংগীতাঙ্গনে। একটি গানের ক্ষেত্রে গীতিকার ও সুরকারের স্বত্ব যেমন রয়েছে, তেমনি নির্দিষ্ট রেকর্ডিংয়েরও আলাদা অধিকার থাকে। ফলে একটি গান বিভিন্ন মাধ্যমে যতবার ব্যবহৃত হয়, স্বত্বের বিষয়টিও তত জটিল হয়ে ওঠে। কপিরাইট ও মেধাস্বত্ব বিশেষজ্ঞ এবং সংগীতশিল্পী জুয়েল মোর্শেদের মতে, দেশে সংগীতের রয়্যালটি কাঠামো এখনো পুরোপুরি কার্যকর নয়। বিশেষ করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে গান ব্যবহারের বিপরীতে রয়্যালটি সংগ্রহ ও সঠিকভাবে বণ্টনের ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।

গীতিকার, সুরকার ও পারফর্মারদের স্বত্ব ব্যবস্থাপনায় কাজ করছে বাংলাদেশ লিরিসিস্ট, কম্পোজারস অ্যান্ড পারফর্মারস সোসাইটি। সংগঠনটির প্রধান নির্বাহী ও সংগীতশিল্পী হামিন আহমেদ মনে করেন, একজন স্রষ্টার পক্ষে নিজের গান কোথায় এবং কতবার ব্যবহৃত হচ্ছে, তার পূর্ণ হিসাব রাখা প্রায় অসম্ভব।

তার মতে, এ ক্ষেত্রে কালেকটিভ ম্যানেজমেন্ট অর্গানাইজেশন বা সিএমও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এমন প্রতিষ্ঠান স্রষ্টার হয়ে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে কনটেন্টের ব্যবহার শনাক্ত করে রয়্যালটি সংগ্রহ ও বণ্টনের কাজ করতে পারে।
সংগীতশিল্পী সুজিত মোস্তফাও বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, কপিরাইট নিয়ে শিল্পীদের লড়াই এখনো শেষ হয়নি। অনেক শিল্পী নিজের অধিকার সম্পর্কেই যথেষ্ট সচেতন নন।
আর সংগীতশিল্পী কাজী শুভর মতে, একটি গান একই সঙ্গে ইউটিউব, ফেসবুক, শর্ট ভিডিও, রিলস ও বিভিন্ন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে অসংখ্যবার ব্যবহৃত হতে পারে। কিন্তু প্রতিটি ব্যবহারের বিপরীতে কার কত টাকা পাওনা এবং সেই অর্থ কীভাবে স্রষ্টার কাছে পৌঁছাবে এই ব্যবস্থাই এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়।

ওটিটিতে নতুন প্রশ্ন
রয়্যালটির বিষয়টি শুধু গানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ওটিটি প্ল্যাটফর্মে নাটক, ওয়েব সিরিজ ও সিনেমার জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিনয়শিল্পী, পরিচালক ও চিত্রনাট্যকারদের পারিশ্রমিক এবং স্বত্ব নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিভিন্ন আলোচনায় অভিনয়শিল্পীরা জানিয়েছেন, অনেক সময় তারা জানতেই পারেন না তাদের পুরোনো কাজ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নতুন করে আয় করছে কি না। তাদের প্রশ্ন একটি কাজের জনপ্রিয়তা যদি দীর্ঘদিন ধরে আয় তৈরি করে, তাহলে সেই আয়ের সঙ্গে শিল্পীর কোনো অংশীদারত্ব থাকবে না কেন?

তবে এ বিষয়ে ভিন্ন মতও রয়েছে। পরিচালক তানিম নূরের মতে, কোনো কাজ যদি কমিশনভিত্তিক হয় এবং চুক্তির মাধ্যমে স্বত্ব প্রযোজকের কাছে হস্তান্তর করা হয়, তাহলে পরবর্তীতে রয়্যালটি পাওয়ার দাবি স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হয় না। বরং শুরুতেই লাভ বা আয়ের অংশীদারত্বের বিষয়টি চুক্তিতে নির্ধারণ করা যেতে পারে।
এখানেই মূল সমস্যা চুক্তির ভাষা। কোনো শিল্পী কত সময়ের জন্য স্বত্ব দিচ্ছেন, কোন কোন প্ল্যাটফর্মে কাজটি ব্যবহার করা যাবে, বিদেশে বিক্রি হলে কী হবে, পুনঃপ্রচার বা পুনর্ব্যবহারের ক্ষেত্রে শিল্পীর অংশ থাকবে কি না এসব বিষয় স্পষ্ট না থাকলে ভবিষ্যতে বিরোধ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
ভিউ বাড়লেই আয় বাড়ে না
ডিজিটাল কনটেন্টের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় ভুল ধারণা হলো বেশি ভিউ মানেই বেশি আয়। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। একটি ভিডিও লাখ লাখ মানুষ দেখলেও সেই ভিউ থেকে কত টাকা আয় হবে, তা নির্ভর করে প্ল্যাটফর্মের মনিটাইজেশন নীতি, বিজ্ঞাপনের বাজার, দর্শকের অবস্থান, কনটেন্টের ধরন এবং মালিকানাসহ নানা বিষয়ের ওপর।
অডিও-ভিডিও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ধ্রুব মিউজিক স্টেশনের কর্ণধার ও সংগীতশিল্পী ধ্রুব গুহের ভাষায়, ভিউ কনটেন্টের জনপ্রিয়তা বোঝার অন্যতম দৃশ্যমান মাপকাঠি হলেও ভিউ আর আয় এক বিষয় নয়। একটি কনটেন্টের বিপুল দর্শক থাকলেও তার আর্থিক মূল্য কত, সেটি নির্ভর করে একাধিক বিষয়ের ওপর।

এ কারণে শিল্পীর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে স্বচ্ছ হিসাব। তার কনটেন্ট কতবার ব্যবহৃত হয়েছে, কোন দেশ থেকে দর্শক এসেছে, বিজ্ঞাপন থেকে কত আয় হয়েছে এবং প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে রাজস্ব ভাগাভাগির হার কত এসব তথ্য জানা না গেলে স্রষ্টা নিজের প্রাপ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেন না।
নিজের স্বত্ব নিজের হাতে রাখার চেষ্টা
ডিজিটাল যুগে কিছু স্বাধীন শিল্পী সরাসরি নিজেদের কনটেন্ট বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করছেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কমছে এবং কনটেন্টের মালিকানা ও আয়ের ওপর শিল্পীর নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে। তবে এর পাশাপাশি রয়েছে অনুমতি ছাড়া গান বা ভিডিও প্রকাশ, কপিরাইট লঙ্ঘন ও পাইরেসির সমস্যা। একটি কনটেন্ট যত বেশি জনপ্রিয় হয়, সেটি অননুমোদিতভাবে ব্যবহারের ঝুঁকিও তত বাড়ে।
ফলে শুধু কনটেন্ট তৈরি করলেই দায়িত্ব শেষ নয়; সেই কনটেন্টের মালিকানা, ব্যবহার ও আয়ের হিসাবও নিশ্চিত করতে হচ্ছে স্রষ্টাকে।
সমাধান কোথায়?
সংশ্লিষ্টদের মতে, সমস্যার সমাধানে প্রথমেই প্রয়োজন শিল্পী ও স্রষ্টাদের কপিরাইট সম্পর্কে সচেতন করা। পাশাপাশি কাজের শুরুতেই পরিষ্কার ও স্বচ্ছ চুক্তি করা জরুরি।
চুক্তিতে এককালীন পারিশ্রমিকের পাশাপাশি পুনঃব্যবহার, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, বিদেশে বিক্রি, স্ট্রিমিং এবং ভবিষ্যৎ আয়ের অংশীদারত্বের বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হলে পরবর্তীতে বিরোধ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
এর পাশাপাশি প্রয়োজন কার্যকর কপিরাইট প্রয়োগ, আধুনিক রয়্যালটি ট্র্যাকিং ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী কালেকটিভ ম্যানেজমেন্ট সংগঠন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্রষ্টাদের হয়ে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান রয়্যালটি সংগ্রহ ও বণ্টনের কাজ করে থাকে।
বাংলাদেশেও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে গীতিকার ও সুরকারদের রয়্যালটি সংগ্রহের পদ্ধতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনা হয়েছে।
সব মিলিয়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এখন আর শুধু বিনোদনের জায়গা নয়; এটি বড় একটি অর্থনৈতিক ক্ষেত্র। একটি গান, নাটক কিংবা সিনেমা মুক্তির পরও যদি বছরের পর বছর আয় করতে পারে, তাহলে সেই আয়ের সঙ্গে স্রষ্টার সম্পর্ক কী হবে এই প্রশ্নের উত্তরও পরিষ্কার হওয়া জরুরি।
কারণ ডিজিটাল যুগে শুধু ‘কত ভিউ হয়েছে’ সেটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো-সেই ভিউ থেকে যে অর্থ তৈরি হচ্ছে, তার ন্যায্য অংশ শেষ পর্যন্ত কার হাতে পৌঁছাচ্ছে?












