‘আন্ধার’-এ সুমন সরকারের নতুন ভিজ্যুয়াল ভাষা

বাংলাদেশি সিনেমার সিনেমাটোগ্রাফি নিয়ে যখন কথা হবে, তখন সুমন সরকার নামটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। গত কয়েক বছরে তিনি শুধু সুন্দর ফ্রেম তৈরি করেননি, তিনি প্রমাণ করেছেন, প্রতিটি গল্পের জন্য আলাদা একটি ভিজ্যুয়াল ভাষা তৈরি করা যায়।

No Dorai-এ তিনি কক্সবাজারের সমুদ্রকে ব্যবহার করেছিলেন স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে। বিশাল আকাশ, প্রাকৃতিক আলো এবং খোলা কম্পোজিশন চরিত্রের ভেতরের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে দৃশ্যমান করেছিল।

Laal Moroger Jhuti-তে তাঁর ক্যামেরা হয়ে উঠেছিল আরও ধীর, আরও কবিতার মতো। আলো সেখানে কখনো চরিত্রের পাশে হাঁটেনি, বরং চরিত্রের নিঃসঙ্গতাকে আরও গভীর করেছে।

Surongo-তে এসে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ভাষায় কথা বলেছেন। সংকীর্ণ ফ্রেম, নিয়ন্ত্রিত আলো, ক্লস্ট্রোফোবিক ক্যামেরা মুভমেন্ট সবকিছু মিলিয়ে দর্শককে চরিত্রের মানসিক অবস্থার ভেতরে আটকে ফেলেছিলেন। ছবিটি শুধু বাণিজ্যিকভাবে সফলই হয়নি, এর সিনেমাটোগ্রাফিও ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছিল এবং তাঁকে এনে দেয় তৃতীয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।

এবার সেই যাত্রার নতুন অধ্যায় ‘আন্ধার’। টিজারের কয়েকটি ফ্রেমই বুঝিয়ে দেয়, এটি শুধু আরেকটি হরর সিনেমা নয়, এটি সুমন সরকারের ক্যারিয়ারের আরেকটি ভিজ্যুয়াল এক্সপেরিমেন্ট। এতদিন তিনি প্রকৃতির আলো, বাস্তব লোকেশন আর মানবিক আবেগকে নিজের ছবির প্রধান উপাদান বানিয়েছেন। কিন্তু আন্ধার-এ সেই বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্টাইলাইজড আলো, সাহসী রঙ এবং নিয়ন্ত্রিত অন্ধকার। মনে হয় যেন তিনি নিজের প্রতিষ্ঠিত ভাষার ভেতর থেকেই একটি নতুন উপভাষা তৈরি করছেন।

হরর সিনেমার একটি প্রচলিত ব্যাকরণ আছে। ঠাণ্ডা নীল, ধূসর, ডি-স্যাচুরেটেড রঙ যেখানে অন্ধকারই প্রধান চরিত্র। কিন্তু আন্ধার সেই ব্যাকরণকে অনুসরণ করেনি। আমাদের মাটি, গ্রাম, শহর, উৎসব, কাপড় সবকিছুতেই রঙের উপস্থিতি প্রবল। তাই যদি বাংলাদেশের একটি হরর সিনেমা সত্যিই আমাদের সংস্কৃতির ভেতর থেকে জন্ম নেয়, তাহলে তার ভয়ও হবে আমাদের নিজস্ব। সেই কারণেই আন্ধার-এর রঙ এতটা সাহসী। এখানে লাল শুধু রক্তের প্রতীক নয়, মানসিক আতঙ্কেরও রঙ। নীল শুধু রাত নয়, অজানার অনুভূতি। অ্যাম্বার শুধু আলো নয়, নিরাপত্তার ভাঙন। এই সিদ্ধান্তই ছবিটিকে প্রথম দর্শনেই আলাদা করে দেয়।

টিজারের প্রতিটি ফ্রেম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রঙ এখানে কখনোই কেবল নান্দনিকতার জন্য ব্যবহৃত হয়নি। বিশাল স্তম্ভঘেরা লাল ঘরে চরিত্রকে ক্ষুদ্র করে দেখানো হোক কিংবা নীল আলোয় ঢাকা নির্জন বাড়ির করিডোর প্রতিটি ফ্রেম দর্শকের অবচেতন মনে অস্বস্তি তৈরি করার জন্য নির্মিত। এই অস্বস্তি জাম্প স্কেয়ার থেকে আসে না; আসে আলো, কম্পোজিশন আর স্পেসের ব্যবহার থেকে। টিজারের একটি বিষয় বিশেষভাবে চোখে পড়ে নেগেটিভ স্পেসের ব্যবহার। বড় বড় ফাঁকা জায়গা, চরিত্রের চারপাশে বিশাল শূন্যতা এবং অন্ধকারের সঙ্গে স্থাপত্যের সম্পর্ক। আবার অন্যদিকে, অত্যন্ত টাইট ক্লোজ-আপে চরিত্রের ভয়কে অনুভব করানো হয়েছে। এই দুই বিপরীত স্কেল একই ছবির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখেছে।

ক্যামেরা ভাড়া দেওয়ার ব্যবসার কারণে বাংলাদেশের প্রায় সব শীর্ষস্থানীয় সিনেমাটোগ্রাফারের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছে আমার। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন প্রজেক্টের জন্য ক্যামেরা, লেন্স, টেকনিক্যাল সেটআপ নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন, যাদের কাজের ধরন আলাদা করে মনে থেকে যায়। সুমন সরকার তাদেরই একজন। শুটিং শুরু হওয়ার অনেক আগেই তিনি আমার অফিসে এসেছিলেন। কারণ তখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাকি। এই ছবির জন্য কোন ক্যামেরা ও কোন লেন্স সবচেয়ে উপযুক্ত হবে।

শেষ পর্যন্ত ANDAR সিনেমার শুটিং হয়েছে ARRI Alexa 35 ক্যামেরা এবং ARRI Signature Prime লেন্সে। ক্যামেরা প্যাকেজটি সরবরাহ করেছে Feeha Multimedia Ltd. কিন্তু এই সিদ্ধান্ত মোটেও হুট করে নেওয়া হয়নি।

আমরা একসঙ্গে ক্যামেরা টেস্ট, কালার টেস্ট এবং লেন্স টেস্ট করেছি। বিশেষ করে Cooke S8/i এবং ARRI Signature Prime দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ক্যারেক্টারের লেন্স পাশাপাশি বসিয়ে বিভিন্ন আলো, বিভিন্ন স্কিন টোন এবং বিভিন্ন কালার সেটআপে তুলনামূলক পরীক্ষা করেছি। সেদিন সুমন ভাইকে দেখে যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে, তা হলো তাঁর ধৈর্য। তিনি কোনো সিদ্ধান্ত আন্দাজ করে নেননি। প্রতিটি ফুটেজ মনোযোগ দিয়ে দেখেছেন। কোথায় কনট্রাস্ট কেমন, স্কিন টোন কীভাবে রেন্ডার হচ্ছে, হাইলাইট কীভাবে রোল-অফ করছে, ছায়ায় কতটুকু ডিটেইল থাকছে প্রতিটি বিষয় নিয়ে তিনি সময় নিয়ে আলোচনা করেছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে যদিও Cook S8/i সাজেস্ট করেছিলাম কিন্তু সুমন ভাই বেছে নিলেন Signature Prime. তাঁর এই সিদ্ধান্তই যে সঠিক ছিল তাঁর প্রমাণ পেয়েছি টিজারে। এই লেন্সের স্বচ্ছতা, হাই কনট্রাস্ট, ডিটেইল এবং কালার রেন্ডিশন ছবিটির সাহসী ভিজ্যুয়াল পরিকল্পনার সঙ্গে দারুণভাবে মানিয়ে গেছে। টিজারের ফ্রেমগুলো দেখলেই সেটার প্রমাণ পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের সিনেমা আজ একটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দর্শক এখন শুধু ভালো গল্প নয়, বিশ্বমানের ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতাও প্রত্যাশা করেন। সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে আমাদের আরও এমন সিনেমাটোগ্রাফার দরকার, যারা প্রতিটি ছবির জন্য নতুন ভাষা তৈরি করতে সাহসী। সুমন সরকার সেই বিরল শিল্পীদের একজন।

 

উজ্জল রহমান

চলচ্চিত্র নির্মাতা, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ফিহা মাল্টিমিডিয়া লিঃ

You may also like

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *