সেই দীর্ঘ যাত্রায় এবার এসেছে বড় পরিবর্তন। আর্টসেলের পরিচিত মুখ ও দীর্ঘদিনের ভোকালিস্ট-গিটারিস্ট জর্জ লিংকন ডি কস্টা বর্তমানে ব্যান্ডের নিয়মিত পরিবেশনায় নেই। তাঁর জায়গায় ভোকাল ও গিটারের দায়িত্ব নিয়েছেন ‘বে অব বেঙ্গল’-এর সাবেক ফ্রন্টম্যান বখতিয়ার হোসেন।
বখতিয়ারের জন্য এটি নিছক একটি নতুন ব্যান্ডে যোগ দেওয়া নয়। ছোটবেলা থেকেই আর্টসেল তাঁর কাছে ছিল অনুপ্রেরণার জায়গা। তাই প্রিয় ব্যান্ডের হয়ে মঞ্চে দাঁড়ানোর অনুভূতিকে তিনি দেখছেন বিশেষ সম্মান হিসেবে।
তবে নতুন সদস্যকে নিয়ে পথচলার শুরুটা সহজ ছিল না। ১০ জুলাইয়ের প্রথম বড় শোতে লিংকনকে ছাড়া মঞ্চে ওঠার সময় ব্যান্ডের সদস্যদের মধ্যেই ছিল চাপ ও উদ্বেগ। ড্রামার কাজী আশেকীন শাজুর ভাষায়, সেই আয়োজন ছিল বেশ স্নায়ুচাপের।
কিন্তু মঞ্চে ওঠার পর সেই চাপ অনেকটাই কেটে যায়। দর্শকদের উচ্ছ্বাস ও ভালোবাসা নতুন বাস্তবতাকে সহজ করে দেয়। পরবর্তী সময়ে ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির মঞ্চেও একইভাবে দর্শকদের সাড়া পায় ব্যান্ডটি।
লিংকন কি তবে আর্টসেলের বাইরে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে লিংকন নিয়মিত মঞ্চে না থাকলেও তাঁকে ব্যান্ডের ইতিহাস থেকে আলাদা করে দেখছেন না সদস্যরা। শাজুর বক্তব্য, লিংকন যেখানেই থাকুন, তিনি সবসময় আর্টসেলের সদস্য হিসেবেই থাকবেন।

বরং সামনে কানাডা সফরে আবারও একসঙ্গে মঞ্চে ওঠার পরিকল্পনা রয়েছে। সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়ার কথা এই সফরের। সেখানে লিংকনের পাশাপাশি সিজানও থাকবেন।
অর্থাৎ সদস্যদের পরিবর্তন এলেও সম্পর্কের জায়গায় ছেদ পড়েনি।
আন্তর্জাতিক মঞ্চ নিয়ে আপস নেই
উত্তর আমেরিকা থেকে নিয়মিতই সফরের প্রস্তাব আসে আর্টসেলের কাছে। তবে প্রতিটি প্রস্তাব গ্রহণ করে মঞ্চে ওঠার পক্ষপাতী নয় ব্যান্ডটি।
গিটারিস্ট ইকবাল আসিফ জুয়েল জানিয়েছেন, যন্ত্রপাতি, সেটআপ ও সাউন্ডের মান নিয়ে তারা বেশ সচেতন। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি বা মানসম্মত আয়োজন নিশ্চিত না হলে শুধু সফরের জন্য মঞ্চে উঠতে চান না তাঁরা।

কারণ, দর্শকদের সামনে পারফর্ম করাকে আর্টসেল কেবল উপস্থিতির বিষয় হিসেবে দেখে না। ভক্তদের প্রত্যাশা পূরণ করাটাই তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
পুরোনো আর্টসেল বনাম নতুন আর্টসেল
‘অন্য সময়’ কিংবা ‘অনিকেত প্রান্তর’ আর্টসেলের গান ও অ্যালবাম নিয়ে শ্রোতাদের আবেগ বহু পুরোনো। একটি নির্দিষ্ট প্রজন্মের কাছে এসব গান শুধু সংগীত নয়, বরং জীবনের নানা সময়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি।
কিন্তু সেই নস্টালজিয়ার জায়গায় আটকে থাকতে চায় না আর্টসেল। নতুন অ্যালবাম ‘চতুর্থাংশ’-এ তাই সাউন্ড ও সংগীত ভাবনায় এসেছে পরিবর্তন।
লিড গিটারিস্ট কাজী ফয়সাল আহমেদের মতে, পুরোনো গানের সঙ্গে শ্রোতাদের আবেগ এতটাই গভীর যে নতুন ধরনের সংগীতের সঙ্গে মানিয়ে নিতে কারও কারও সময় লাগতেই পারে। তবে সময়ের সঙ্গে নতুন গানগুলোর সঙ্গেও দর্শক-শ্রোতাদের সংযোগ তৈরি হচ্ছে।
মঞ্চে ‘অদেখা স্বর্গ’ কিংবা ‘অপসরী’র মতো গান পরিবেশন করাও সদস্যদের কাছে আলাদা আনন্দের। পুরোনো ও নতুন দুই সময়ের সংগীতকে একসঙ্গে ধারণ করেই এগিয়ে যেতে চাইছে ব্যান্ডটি।
ইতিহাসও সংরক্ষণ করছে আর্টসেল
শুধু নতুন গান কিংবা নতুন সাউন্ড নয়, নিজেদের দীর্ঘ ইতিহাসকেও ধরে রাখার উদ্যোগ নিয়েছে আর্টসেল। সম্প্রতি চালু হয়েছে ব্যান্ডটির নতুন ওয়েবসাইট ‘artcell.band’। সেখানে ব্যান্ডের ইতিহাস, সদস্য ও সংগীত নিয়ে নানা তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
সেই ওয়েবসাইটের চ্যাটবটে আর্টসেলের পুরোনো বিতর্ক নিয়ে প্রশ্ন করলে উঠে আসে সাবেক প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এরশাদ জামানের প্রসঙ্গও।
তবে বর্তমান সদস্যদের কাছে অতীতের সেই অধ্যায় কোনো বিরোধের গল্প নয়। বরং আর্টসেলের দীর্ঘ পথচলার একটি অংশ হিসেবেই তাঁরা বিষয়টিকে দেখেন।
শাজুর ভাষায়, এরশাদ একজন দুর্দান্ত গিটারিস্ট। তাঁর সঙ্গে দেখা হলে স্বাভাবিকভাবেই কুশল বিনিময় হয় এবং তাঁর ও তাঁর সংগীতের জন্য শুভকামনা থাকে।
বদলাচ্ছে সময়, বদলাচ্ছে আর্টসেলও
একদিকে লিংকনের অনুপস্থিতি, অন্যদিকে নতুন সদস্যের আগমন আর্টসেলের বর্তমান সময়টা নিঃসন্দেহে পরিবর্তনের। কিন্তু সেই পরিবর্তন তাদের মূল পরিচয় মুছে দিচ্ছে না।
পুরোনো গান, দীর্ঘদিনের ভক্ত, নিজেদের সংগীতের প্রতি দায়বদ্ধতা সবকিছুকে সঙ্গে রেখেই নতুন সাউন্ড ও নতুন অভিজ্ঞতার দিকে এগোচ্ছে ব্যান্ডটি।
হয়তো এটাই আর্টসেলের সবচেয়ে বড় শক্তি। তারা অতীতকে অস্বীকার করছে না, আবার অতীতের মধ্যেই আটকে থাকতেও চাইছে না।
শেকড়টা একই রেখে সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়ার এই যাত্রাই হয়তো আর্টসেলকে একটি ব্যান্ডের চেয়েও বড় কিছুতে পরিণত করেছে একটি প্রজন্মের সংগীতস্মৃতি, আবেগ আর নিজস্ব সংস্কৃতি; যাকে ভক্তরা ভালোবেসে নাম দিয়েছে ‘আর্টসেলিজম’।












