ঘটনাগুলো নিয়ে দেশের সংগীতাঙ্গনের কয়েকজন পরিচিত শিল্পী ও সুরকারের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে প্রায় একই ধরনের উদ্বেগ। তাঁদের মতে, কোনো অনুষ্ঠান নিয়ে সমস্যা থাকলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যেতে পারে। কিন্তু আয়োজনের একেবারে শেষ মুহূর্তে কনসার্ট বাতিল হলে শুধু শিল্পীরাই নন, আয়োজক, যন্ত্রশিল্পী, কর্মী ও দর্শকরাও ক্ষতির মুখে পড়েন।
‘সংস্কৃতিকে সরিয়ে দিলে দেশ এগোবে কীভাবে’

সুরকার ও সংগীত পরিচালক শেখ সাদী খানের মতে, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো একেবারেই বেমানান। বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো সংগীতের ঐতিহ্যবাহী একটি জেলায় সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধ হওয়ার বিষয়টি তাঁকে বেশি ভাবাচ্ছে।
তিনি মনে করেন, শব্দের মাত্রা নিয়ে আপত্তি থাকলে সেটি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা যেত। কিন্তু কোনো সমস্যা দেখা দিলেই অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া সমাধান হতে পারে না। তাঁর ভাষায়, সংস্কৃতি একটি জাতির পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ; তাই সাংস্কৃতিক চর্চাকে সংকুচিত করার যেকোনো প্রবণতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের স্পষ্ট অবস্থান প্রয়োজন।
শেখ সাদী খান মনে করেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও দেশের সংস্কৃতির প্রশ্নে সবাইকে এক জায়গায় আসতে হবে। তাঁর মতে, সংস্কৃতি ও রাজনীতির মধ্যে সুস্থ সমন্বয় না থাকলে একটি দেশের সামগ্রিক অগ্রগতিও বাধাগ্রস্ত হয়।
‘অনুষ্ঠান বন্ধ হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি শিল্পীদের’
কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমীনের উদ্বেগের জায়গা মূলত শিল্পীদের আর্থিক ও পেশাগত ক্ষতি। তাঁর মতে, একটি কনসার্ট আয়োজনের পেছনে শুধু একজন গায়ক বা ব্যান্ড থাকে না; যুক্ত থাকেন অসংখ্য যন্ত্রশিল্পী, আয়োজক, টেকনিশিয়ান ও কর্মী।

সব প্রস্তুতি শেষ হওয়ার পর অনুষ্ঠান বাতিল হলে তাঁদের সবার ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হয়। কোনো আয়োজন নিয়ে প্রশাসনের আপত্তি থাকলে সেটি প্রস্তুতির আগেই আয়োজকদের জানানো উচিত বলে মনে করেন তিনি।
সাবিনা ইয়াসমীনের মতে, সংগীত কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়; এটি একটি দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মানুষের জীবনযাপনের অংশ। তাই গানবাজনা বন্ধ না করে বরং সাংস্কৃতিক আয়োজনগুলোকে নিয়মতান্ত্রিক ও নিরাপদভাবে পরিচালনার পরিবেশ তৈরি করা দরকার।
‘আপত্তি করলেই অনুষ্ঠান বন্ধ এটা প্রশ্রয়’

ব্যান্ড তারকা হামিন আহমেদের বক্তব্য আরও সরাসরি। তাঁর মতে, কনসার্টের নিবন্ধন বা প্রশাসনিক কোনো কারণকে সামনে এনে শেষ মুহূর্তে আয়োজন বাতিল করার বিষয়টি মূল সমস্যাকে আড়াল করতে পারে।
গত কয়েক বছরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ঘিরে বাধা ও শিল্পীদের হয়রানির একাধিক ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, আগের ঘটনাগুলোতে দৃশ্যমান কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণেই একটি বিশেষ মহল আরও উৎসাহিত হয়েছে।
হামিনের দাবি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জের ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কোনো গোষ্ঠীর আপত্তি বা হুমকির কারণে প্রশাসনের প্রথম কাজ অনুষ্ঠান বাতিল করা হতে পারে না। বরং শিল্পী, দর্শক ও আয়োজকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে অনুষ্ঠানটি কীভাবে চালানো যায়, সেটিই প্রশাসনের দায়িত্ব হওয়া উচিত।
তাঁর মতে, একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধের এই প্রবণতা যদি স্বাভাবিক হয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে যেকোনো গোষ্ঠী শুধু আপত্তি জানিয়ে বা হুমকি দিয়ে নিজেদের পছন্দের বাইরে থাকা অনুষ্ঠান বন্ধ করার সুযোগ পেয়ে যাবে।
বেবী নাজনীন: ‘শিল্পীরা ভয় পেয়ে গেলে সংস্কৃতিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে’
কণ্ঠশিল্পী বেবী নাজনীন মনে করেন, সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়লে একটি দেশের সামগ্রিক পরিচয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাঁর মতে, শিল্পীদের বড় একটি আয়ের উৎস কনসার্ট। তাই বারবার অনুষ্ঠান বাতিল হলে শিল্পীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

তিনি মনে করেন, কোনো কোনো গোষ্ঠী শিল্পীদের ভয় দেখিয়ে কিংবা নিরুৎসাহিত করে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চাইতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের দায়িত্ব আরও বেশি।
বেবী নাজনীনের মতে, শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক, খেলোয়াড় কিংবা অন্য যেকোনো পেশার মানুষের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সাংস্কৃতিক আয়োজনকে ঘিরে কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত কারণ বের করা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
ন্যান্সি: ‘ব্যক্তিগত অপছন্দের কারণে সবার অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না’

কণ্ঠশিল্পী নাজমুন মুনিরা ন্যান্সির প্রশ্নটা আরও মৌলিক কোনো একজনের পছন্দ না হওয়ার কারণে কেন অন্যদের সাংস্কৃতিক অধিকার সীমিত হবে?
তাঁর মতে, একজন শিল্পীর গান কারও ভালো নাও লাগতে পারে। সেটি স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ব্যক্তিগত অপছন্দের কারণে যারা গানটি শুনতে চান, তাঁদের অধিকারও তো অস্বীকার করা যায় না।
ন্যান্সি মনে করেন, কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়ে আপত্তি উঠলে প্রশাসনের উচিত বিষয়টির যৌক্তিকতা যাচাই করা। সত্যিই কোনো সমস্যা থাকলে নিয়ম মেনে সমাধান খুঁজতে হবে। কিন্তু অযৌক্তিক আপত্তির কারণে সরাসরি অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া সংস্কৃতির জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে না।
বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি ও যাত্রাপালার মতো ঐতিহ্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, যেসব সাংস্কৃতিক মাধ্যম ইতিমধ্যেই সংকটে রয়েছে, সেগুলোকে আরও যত্নের সঙ্গে সংরক্ষণ করা দরকার।
এখন সরকারের দিকে তাকিয়ে শিল্পীরা
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জের সাম্প্রতিক ঘটনা ঘিরে শিল্পীদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—তাঁরা শুধু কনসার্ট আয়োজনের অনুমতি চান না, বরং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল পরিবেশ চান।
শিল্পীদের মতে, কোনো অনুষ্ঠান আইনবহির্ভূত হলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাষ্ট্রের রয়েছে। কিন্তু শুধুমাত্র কোনো গোষ্ঠীর আপত্তি, হুমকি কিংবা ব্যক্তিগত অপছন্দের কারণে বৈধ সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধ হয়ে গেলে তা ভবিষ্যতের জন্য একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।
এখন তাই প্রশ্ন শুধু দুটি কনসার্ট কেন বন্ধ হলো, তা নয়। বড় প্রশ্ন হলো দেশের শিল্পীরা কি তাঁদের কাজ করার জন্য যথেষ্ট নিরাপদ ও স্বাধীন পরিবেশ পাচ্ছেন?
এই প্রশ্নের উত্তর এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে সরকারের অবস্থান কী হবে, সেদিকেই এখন নজর সাংস্কৃতিক অঙ্গনের।












