ইউটিউবের শীর্ষ ১০ নাটকের ৫টিই মহিন খানের

DramaUPDATE

গল্পকেই দেন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব

মহিন খান মনে করেন, একটি নাটকের সাফল্যের মূল জায়গা হলো গল্প। বড় তারকা, চমকপ্রদ উপস্থাপনা কিংবা বড় বাজেট থাকলেই দর্শক নাটক দেখবেন এমনটা তিনি মনে করেন না। গল্পে দর্শক নিজেদের খুঁজে পেলেই তৈরি হয় সংযোগ।

তাই গল্প নির্বাচন ও চিত্রনাট্য তৈরিতে যথেষ্ট সময় দেন তিনি। নিজের চারপাশের মানুষ ও ঘটনা থেকে চরিত্র এবং গল্পের উপাদান সংগ্রহ করেন। যে বিষয়গুলো নিয়ে মানুষ ভাবছে, কথা বলছে কিংবা আলোচনা করছে, সেগুলোই তাঁকে নতুন গল্পের দিকে টানে।

নিজের কাজের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করেন মহিন। চিত্রনাট্য লেখার সময় নিজেকে দর্শকের জায়গায় বসিয়ে ভাবেন এই গল্প দেখলে তিনি নিজে কী অনুভব করতেন, সংলাপগুলো তাঁর কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হতো। নিজেই যখন কোনো গল্পে বিশ্বাসী হন, তখনই সেটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন।

ভিউয়ের কথা মাথায় রাখেন, তবে সরাসরি নয়

ইউটিউব এখন নাটক দেখার অন্যতম প্রধান প্ল্যাটফর্ম। ফলে নির্মাতাদের জন্য ভিউ গুরুত্বপূর্ণ হলেও মহিন খান জানান, চিত্রনাট্য লেখার সময় তিনি সরাসরি ভিউয়ের হিসাব কষে গল্প তৈরি করেন না। তাঁর বিশ্বাস, গল্প ও চরিত্র ঠিক থাকলে দর্শক এমনিতেই নাটকটি গ্রহণ করবেন।

তবে বর্তমান সময়ের দর্শক কী দেখছেন, কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে এবং ইউটিউবের দর্শকদের পরিবর্তিত রুচি কী—এসব বিষয়ে তাঁকে আপডেট থাকতে হয়। তাঁর মতে, ভিউয়ের বিষয়টি এখন গল্প ভাবনার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই যুক্ত হয়ে গেছে।

নিলয়-হিমির সঙ্গে বিশেষ বোঝাপড়া

মহিন খানের নির্মিত প্রায় ২৫০টি নাটকের মধ্যে প্রায় ৫০টিতে জুটি হিসেবে অভিনয় করেছেন নিলয় আলমগীর ও জান্নাতুল সুমাইয়া হিমি। তাঁদের সঙ্গে কাজের বোঝাপড়াটাকেই এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখেন নির্মাতা।

দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করার ফলে অভিনয়শিল্পীদের শক্তির জায়গাগুলো সম্পর্কে তাঁর ভালো ধারণা তৈরি হয়েছে। কোন দৃশ্যে তাঁদের কীভাবে ব্যবহার করলে চরিত্রটি আরও ভালোভাবে ফুটে উঠবে, কিংবা দর্শকের কাছে কোন বিষয়গুলো বেশি গ্রহণযোগ্য হবে—সেটিও অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারেন তিনি। ফলে গল্প ভাবার সময়ই অনেক ক্ষেত্রে এই জুটির কথা তাঁর মাথায় আসে।

ধারাবাহিক সাফল্য ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ

একটি নাটক কোটি কোটি মানুষ দেখলেও পরের নাটকটি একই রকম দর্শক পাবে এমন নিশ্চয়তা নেই। মহিনের কাছেও এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখাই সবচেয়ে কঠিন কাজ।

কোন নাটক দর্শক কীভাবে গ্রহণ করবেন, তা আগে থেকে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিও কখনো কখনো নাটকের ভিউয়ে প্রভাব ফেলে। তাই কোনো একটি নাটকের ভিউ কমে গেলে সেটি নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা না করে গল্প বলার মান ঠিক রাখার দিকেই মনোযোগ দেন তিনি।

অভিনেতা হওয়ার ইচ্ছা থেকেই পরিচালনায়

মহিন খানের শুরুটা অবশ্য পরিচালক হিসেবে নয়, অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে। মঞ্চে অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর যাত্রা শুরু। সেখানেই পরিচয় হয় অভিনেতা ও পরিচালক শামীম জামানের সঙ্গে। অভিনয়ের ইচ্ছার কথা জানালে শামীম জামান তাঁকে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার পরামর্শ দেন।

২০১৫ সালে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন মহিন। কাজ করতে করতে নির্মাণের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর। নিজের ভাবনা পর্দায় তুলে ধরে দর্শকের সরাসরি প্রতিক্রিয়া পাওয়ার বিষয়টি তাঁকে আকৃষ্ট করে। একসময় অভিনয়ের চেয়ে পরিচালনাকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন তিনি।

সহকারী পরিচালক হিসেবে ছিল কঠিন সময়

আজকের সাফল্যের পেছনে মহিন খানের রয়েছে কঠিন সময়ের অভিজ্ঞতা। সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার সময় নিয়মিত পারিশ্রমিক না পাওয়ার অভিজ্ঞতাও হয়েছে তাঁর। সেই সময় সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে ছোট একটি জায়গায় থাকতে হয়েছে।

তবে সেই সময়কে শুধুই সংগ্রাম হিসেবে দেখতে চান না মহিন। তাঁর মতে, ওই সময়ের অভিজ্ঞতা তাঁকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। শুটিং সেটে নানা ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। কখনো অভিনয়শিল্পীদের রাগ, কখনো পরিচালকের চাপ সবই সামলাতে হয়েছে সহকারী হিসেবে।

একবার একজন অভিনয়শিল্পীকে দৃশ্য ধারণের জন্য ডাকতে গিয়ে অপমানিতও হয়েছিলেন তিনি। ওই শিল্পী পরে পরিচালকের কাছে উল্টো দাবি করেন যে মহিন তাঁকে ডাকেননি। ঘটনাটি তাঁকে সেদিন ভীষণভাবে অপমানিত করেছিল। তবে এমন অভিজ্ঞতাগুলোই পরবর্তী সময়ে কাজে আরও মনোযোগী হতে তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছে।

বদলে গেছে নাটক নির্মাণের পরিবেশ

নাট্যাঙ্গনে দীর্ঘ সময় কাজ করে মহিন খান দেখেছেন বড় ধরনের পরিবর্তন। তাঁর মতে, আগের তুলনায় এখন নাটকের কারিগরি মান অনেক উন্নত হয়েছে। বেড়েছে নির্মাণ বাজেট, শুটিংয়ের পরিসর এবং লোকেশনের বৈচিত্র্য। দেশের বিভিন্ন প্রান্তেও এখন নিয়মিত নাটকের শুটিং হচ্ছে।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করেন তিনি। যে সময়ে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেও পারিশ্রমিক পাওয়া কঠিন ছিল, এখন তাঁর সহকারীরা অনেক ক্ষেত্রে কাজ শুরুর আগেই অগ্রিম পারিশ্রমিক পান।

সমালোচনাকেও স্বাভাবিকভাবে দেখেন

সফলতার পাশাপাশি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াও পান মহিন খান। তবে এ নিয়ে বিতর্কে যেতে চান না তিনি। তাঁর মতে, কোনো নির্মাতা বা শিল্পীই সবাইকে সন্তুষ্ট করতে পারবেন না। যত ভালো কাজই হোক, সমালোচনা থাকবেই।

তাই সমালোচনাকে এড়িয়ে না গিয়ে বরং নিজের কাজের মান আরও ভালো করার চেষ্টা করেন তিনি। দর্শক যেমন তাঁর নাটক পছন্দ করেন, তেমনি যাঁরা সমালোচনা করেন, তাঁরাও একসময় তাঁর কাজ দেখে সন্তুষ্ট হবেন এই লক্ষ্যেই এগিয়ে যেতে চান মহিন।

প্রায় ২৫০ নাটকের নির্মাতা হিসেবে কোটি ভিউয়ের ধারাবাহিক সাফল্য এবং ইউটিউবের সর্বাধিক দেখা নাটকের তালিকায় পাঁচটি নাটক থাকা তাঁর ক্যারিয়ারের বড় অর্জন। তবে মহিন খানের কাছে সংখ্যার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দর্শকের সঙ্গে গল্পের সংযোগ। সেই সংযোগ ধরে রেখেই সামনে আরও ভালো গল্প নির্মাণ করতে চান তিনি।

You may also like

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *